

নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেগা ফাইনালে যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, ফুটবলবিশ্ব তখন নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী। অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই শেষে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে স্তব্ধ করে ফিফা বিশ্বকাপের কাঙ্ক্ষিত শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছে স্পেন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু একটি টুর্নামেন্টেরই শেষ হয়নি, বরং রচিত হয়েছে ফুটবলবিশ্বের এক নতুন মহাকাব্য। এবারের ৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপটি তাই স্প্যানিশ ফুটবলের এক অনন্য মাইলফলক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এবারের বিশ্বকাপটি ছিল সবদিক থেকেই আলাদা এবং রোমাঞ্চময়। স্পেনের জন্য এই জয় ছিল বিশেষ কিছু। ২০১০ সালের পর এটি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বজয়, আর কাকতালীয়ভাবে সেটিও এলো সেই একই সমীকরণে—অতিরিক্ত সময়ের পর ১-০ গোলের জয়ে। তবে এবারের অর্জন স্পেনকে নিয়ে গেছে এক অভাবনীয় উচ্চতায়। ২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপ জয়ী স্পেন ইতিহাস গড়ে প্রথম দেশ হিসেবে একই সঙ্গে ফিফার পুরুষ ও নারী উভয় শিরোপা নিজেদের দখলে রাখার এক অভূতপূর্ব ‘বৈশ্বিক ডাবল’ অর্জন করেছে।
স্প্যানিশদের এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল তাদের ইস্পাতদৃঢ় রক্ষণভাগ। পুরো টুর্নামেন্টের আটটি ম্যাচে ‘লা রোজা’ খ্যাত দলটি গোল হজম করেছে মাত্র একটি, যা বিশ্বকাপজয়ী যে কোনো দলের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান গোলরক্ষক উনাই সিমনের। তিনি টুর্নামেন্টে সাতটি ‘ক্লিনশিট’ রেখে এক আসরে কোনো গোলরক্ষকের জন্য সর্বোচ্চ ক্লিনশিটের নতুন রেকর্ড গড়েছেন। এই জয়ের মাধ্যমে স্পেনের টানা অপরাজিত থাকার দৌড় গিয়ে ঠেকল ৩৮ ম্যাচে, আর পুরো আসরে তাদের ১৪ গোল ছিল বিশ্বকাপে তাদের সর্বোচ্চ গোলের পরিসংখ্যান।
অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক দারুণ মেলবন্ধন ছিল স্পেনের এই দলে। ৬৫ বছর ২৮ দিন বয়সে শিরোপা জিতে লুইস দে লা ফুয়েন্তে ভেঙে দিয়েছেন ভিসেন্তে দেল বস্কের রেকর্ড, হয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ। অন্যদিকে, দলের দুই তরুণ তুর্কি—১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল এবং পাউ কুবারসি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন। পেলে, জিউসেপ্পে বার্গোমি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো কিংবদন্তিদের পাশে নাম লিখিয়ে তারাও এখন কিশোর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাওয়া খেলোয়াড়দের এক্সক্লুসিভ ক্লাবের সদস্য। টুর্নামেন্টে আটটি করে ম্যাচ খেলে ২০ বছর বয়সের আগে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও এখন এই দুই স্প্যানিশ তরুণের দখলে।
ফাইনালের মঞ্চে পরাজয় জুটলেও আর্জেন্টিনার লড়াই ছিল প্রশংসনীয়। টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ফাইনালে আসা দলটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছে। তবে এই ম্যাচটি আলাদাভাবে লেখা থাকবে লিওনেল মেসির জন্য। ৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে ফাইনালে মাঠে নেমে তিনি বিশ্বকাপে তার উপস্থিতির রেকর্ডকে ৩৪ ম্যাচে উন্নীত করেছেন, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ। তিনিই এখন ফাইনালের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড়।
সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্ডির সঙ্গে তিনিও মেগা ফাইনালে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড়দের তালিকায় নিজের নাম তুলেছেন। ১০৪টি ম্যাচ, ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড় এবং গড়ে ২.৯৬টি হিসাবে মোট ৩০৮টি গোলের এই টুর্নামেন্ট নিয়ে ফিফার চিফ অব গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট আর্সেন ওয়েঙ্গার যথার্থই বলেছেন, ‘এ আসর শুধু বিশালতার জন্যই নয়, খেলোয়াড়দের শারীরিক তীব্রতা এবং প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
নিউইয়র্কের এ ফাইনাল তাই শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল নয়; এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ছেলেমেয়ের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প। স্পেন বিশ্বজয়ী হলো, আর ফুটবল আরও একবার প্রমাণ করল—কেন এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর খেলা।