

ঘন কুয়াশার কারণে গত শুক্রবার সারারাত বন্ধ ছিল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল। গতকাল শনিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। তবে ফেরি-লঞ্চ চলাচল বন্ধের সময় বিপজ্জনকভাবে ইঞ্জিনচালিত ছোট ট্রলার দিয়ে যাত্রী পারাপার চলে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দীন বলেন, গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড় ৭টা থেকে কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়। শনিবার ৯টা ৪০ মিনিটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়। তিনি বলেন, মূলত দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। কয়েকদিন ধরে পদ্মা নদীতে কুয়াশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় ফেরি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। কুয়াশার ঘনত্ব কমে গেলে ফের ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়। বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ১৫টি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে।
তবে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একশ্রেণির অসাধু মাঝি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে যাত্রী পারাপার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে এসব ট্রলার চলাচল করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, প্রয়োজনীয় লাইফ জ্যাকেট, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই যাত্রী নিয়ে নদী পারাপার করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে অবৈধভাবে ট্রলার চলাচল হলেও বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ, নৌপুলিশ কিংবা উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ে না বলেও তাদের অভিযোগ।
সরেজমিন দেখা যায়, শনিবার ভোরে ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাটে কোনো ফেরি ছিল না। ফেরি বন্ধ থাকার পরও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে যাত্রী পারাপার করতে দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দৌলতদিয়া ঘাটের কিছু প্রভাবশালী ও অসাধু ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের মাঝি ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীদের পারাপার করছে। গত শুক্রবার রাত ৯টায় দেখা যায়, দৌলতদিয়া প্রান্তের ফেরিঘাট দিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে।
মিথিলা নামে এক যাত্রী বলেন, পরিবার নিয়ে জরুরি কাজে যেতে হচ্ছে। ফেরি নেই, লঞ্চ নেই—তাই ঝুঁকি জেনেও ট্রলারে উঠতে বাধ্য হচ্ছি। মানিকগঞ্জের গড়পাড়া থেকে আসা সাইদুল নামে এক যাত্রী বলেন, পাটুরিয়া থেকে ট্রলারে পার হয়ে দৌলতদিয়ায় এলাম। নদীতে অনেক কুয়াশা। ট্রলারে পার না হলে ১২টা-১টা বাজত। তা-ও অনিশ্চিত। ট্রলারে ভাড়া নিল ১০০ টাকা। ট্রলারে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো যাত্রী ছিল।
শুক্রবার রাতে ৭ নম্বর ফেরিঘাটে কথা হয় শিশির বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ট্রলারে করে নদী পার হতে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ভাড়া চাচ্ছে। আমরা এখানে ১০ থেকে ১২ জন আছি। রাত ৯টার পর ঘাটে পৌঁছাই। এ মুহূর্তে ফেরি-লঞ্চ দুইটাই বন্ধ। আমাদের যাওয়ার একটাই মাধ্যম ছিল, এখানে আমি প্রশাসনের কোনো নজরদারি দেখছি না।
ইমদাদুল নামে আরেকজন বলেন, ট্রলারে যাওয়া যাবে না, পারাপারে তো কর্তৃপক্ষ থেকে নিষেধ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কারও নজরদারিও নেই ঘাটে। নজরদারি থাকলে অসাধু ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের মাঝিরা নদীতে আর নামতে পারবে না, ঝুঁকি নিয়ে যাতে যাত্রী পারাপার না হয়, সেটাই চাই।
দৌলতদিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা বলেন, ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার চলাচল ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে লোকবল সংকট ও নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা হওয়ায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ঘন কুয়াশায় ইঞ্জিনচালিত নৌযানে নদী পারাপার খুব বিপজ্জনক। এটা তো ক্ষতিকর, নৌপুলিশের কাছে এ বিষয়ে হেল্প চাইব। প্রশাসনের বিষয়টি দেখার আছে। তারপর বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা কাজ করবেন, আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করব।
ফরিদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশের পুলিশ সুপার, আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে। গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, বিষয়টি নজরে ছিল না, আপনার মাধ্যমে জানলাম। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতে হবে। ঘন কুয়াশার কারণে অন্য নৌযান যেভাবে বন্ধ থাকে ট্রলারও বন্ধ থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।