

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দলীয় প্রাথমিক মনোনয়ন আবেদন ফরমে বার্ষিক প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয় দেখিয়ে আলোচনায় আসেন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে তার জমা দেওয়া হলফনামায় চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
হলফনামায় ৩২ বছর বয়সী এই ইতালি প্রবাসী সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থী তার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন প্রায় এক কোটি টাকা। একই প্রার্থীর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই নথিতে বার্ষিক আয়ের বিশাল এই ব্যবধান নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। একই ব্যক্তির আয়ের দুই ধরনের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। সব মিলিয়ে গণঅধিকারের এই প্রার্থীকে ঘিরে বিতর্কের পালে লাগা হাওয়া যেন আরও জোর পেয়েছে।
এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর দলীয় প্রাথমিক মনোনয়ন আবেদন ফরমে ইয়ামিন এইচ এম ফারদিনের বার্ষিক প্রায় ‘হাজার কোটি টাকা’ আয় উল্লেখের তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় দৈনিক কালবেলায়। আর এর পর থেকেই ফারদিনকে নিয়ে শুধু বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, জাতীয় রাজনীতি এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন ওঠে, গণঅধিকারের ৩২ বছর বয়সী এই এমপি প্রার্থীর বার্ষিক আয় প্রকৃতই হাজার কোটি টাকা কি না। আর তা হলে তার এই বিপুল আয়ের উৎস কী, ব্যবসা বৈধ কি না এবং বৈধ হলেও দ্রুতই এমন বিশাল অঙ্কের আয় সম্ভব কি না—এমন নানা জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খেতে থাকে জনমনে। অনেকেই প্রবাসে ফারদিনের কথিত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখার দাবি তোলেন।
যদিও ফারদিন আগেই দাবি করেছেন, দলীয় প্রাথমিক মনোনয়ন আবেদন ফরমে দেওয়া তার বার্ষিক আয়ের তথ্যটি ছিল ভুল। পরে সংশোধিত আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন জানালেও সেই আবেদনের নথির কোনো অনুলিপি দেখাতে পারেননি বরিশালের মুলাদী উপজেলার পশ্চিম নাজিরপুর গ্রামের আমির হোসেন হাওলাদার ও মমতাজ বেগম দম্পতির ছেলে ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন। তিনি প্রবাসী অধিকার পরিষদ ইতালি শাখার সভাপতি ও গণঅধিকার পরিষদ বরিশাল জেলা শাখার সহসভাপতি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো বক্তব্য নেই। যা মনে হয় লিখুন।’নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ইয়ামিন এইচ এম ফারদিনের হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ‘ইয়ামিন ট্রেডিং করপোরেশন’ থেকে ফারদিনের বার্ষিক আয় চার লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ টাকা। রেমিট্যান্সসহ অন্যান্য উৎস থেকে আসে ৯৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫৪৪ টাকা। আর নগদ অর্থ রয়েছে ৪৪ লাখ ৬৯ হাজার ১৪৪ টাকা।
এ ছাড়াও পাঁচটি ব্যাংকে জামানত রয়েছে মোট ৩ হাজার ৬৩২ টাকা। ৬ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য ও ৪ লাখ টাকার আসবাবপত্র, স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নিজের নামে ২৪ লাখ এবং স্ত্রীর নামে ১০ লাখ টাকার অকৃষি জমি, ইতালিতে ৭০ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি এবং নিজের ৪০ ও স্ত্রী জান্নাত আক্তারের কাছে ৩০ ভরি স্বর্ণালংকারসহ মোট ৭০ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে।
পেশায় ব্যবসায়ী উল্লেখ করে ফারদিন নিজেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী দাবি করেছেন। হলফনামার তথ্যে মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও প্রাথমিক আবেদনে উল্লেখ করা বার্ষিক প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয়ের তথ্যের সঙ্গে এর কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে ফের তার আয় বা অর্জিত সম্পদের স্বচ্ছতা এবং হলফনামায় উল্লেখ করা সম্পদের বিবরণের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সম্পাদক রফিকুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সম্পদ ও আয়ের তথ্য শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি ভোটারদের আস্থা ও প্রার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ভুলবশত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, আয়ের এমন বড় ব্যবধান প্রার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে।’