

শিল্পকারখানার নিজস্ব ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ক্ষমতা পাঁচ মেগাওয়াটের বেশি হলে গ্যাস সরবরাহ করা হবে না। সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত পূর্বের আদেশ সংশোধন করে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই আদেশ জারি হয় গত ২৪ আগস্ট।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত এই অফিস আদেশ পেট্রোবাংলা, গ্যাসের সব বিতরণ কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
আগের আদেশ অনুযায়ী, শিল্পকারখানায় ১০ মেগাওয়াটের ওপরে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হতো। ১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সংযোগ অনুমোদনের এখতিয়ার ছিল গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর। নতুন আদেশে এই সীমা কমিয়ে পাঁচ মেগাওয়াট করা হয়েছে।
শিল্পকারখানার ক্যাপটিভে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অন্যদিকে, এ বিষয়ে উদাসীন ছিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং তাদের অধীন বিতরণ কোম্পানিগুলো। ফলে দেখা গেছে, গ্যাসের অভাবে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকলেও মূল্যবান গ্যাস চলে গেছে ক্যাপটিভ ব্যবহারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে চার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলেও একই পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন হয় ছয় মেগাওয়াট। অর্থাৎ, ক্যাপটিভ ব্যবস্থার তুলনায় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেড় গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ২০২১ সালের আগে পর্যন্ত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সংযোগ নিয়ে কোনো নীতিমালা ছিল না। প্রথমবারের মতো ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট সরকার একটি পরিপত্র জারি করে। এতে বলা হয়, ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে হলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। এই আদেশের পর ১০ মেগাওয়াটের বেশি সংযোগের কোনো নজির পাওয়া যায়নি, শুধু টিকে গ্রুপ ছাড়া। তাদের স্টিল মিলসে ১৬ দশমিক ৮ মেগাওয়াট সংযোগের অনুমোদন দেওয়া হলেও ভুয়া এনওসি দাখিলের অভিযোগ থাকায় তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
পেট্রোবাংলার হিসেব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছে মোট ৯ হাজার ৭২৪ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস, আর ক্যাপটিভ ব্যবস্থায় সরবরাহ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩১০ মিলিয়ন ঘনমিটার।
পেট্রোবাংলার ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বরের গ্যাস সরবরাহ বিবরণী অনুযায়ী, ওই দিন বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছে ৬১৩ মিলিয়ন ঘনফুট, আর ক্যাপটিভ ব্যবস্থায় সরবরাহ করা হয়েছে ১০২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
তবে গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা ছয়টি কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সবচেয়ে বড় বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৫১ মিলিয়ন ঘনমিটার, আর ক্যাপটিভে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৯৮৯ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছে ৪৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং ক্যাপটিভে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৬৭ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৭২ মেগাওয়াট, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বেশি। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৩ হাজার ৬৮৫ মেগাওয়াট এবং ডিজেলভিত্তিক ৩ হাজার ৮৭ মেগাওয়াট। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স ইস্যুর সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৭টি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২৫টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫৯টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩১০টি লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বরের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ২ হাজার ৪৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৬১৩ মিলিয়ন ঘনফুট। ওই দিন গ্যাস সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল।
বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন নেমে এসেছে ১ হাজার ৭২০ মিলিয়ন ঘনফুটে। আমদানি করেও এই সংকট সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের খরচ প্রায় ১ টাকা, কিন্তু আমদানি করা গ্যাসের খরচ প্রায় ৬৫ টাকা। তদুপরি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আগামী দুই বছরে আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগও নেই।