

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ সালে প্রণয়নের পর কেটে গেছে দেড় দশক। আইনি নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে নোট-গাইড ও কোচিং ব্যবসায়ীরা কলকাঠি নাড়ায় ১৫ বছর ধরে ঝুলে আছে শিক্ষা আইন। সংশ্লিষ্টদের প্রবল বাধার মুখে দুবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আর একবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে ফেরত আসে এই আইনের খসড়া। অবশেষে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে শিক্ষা আইন ২০২৬ চূড়ান্ত করতে ফের তোড়জোড় শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবার কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এ আইনের ওপর মতামত দিতে সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র পাঁচ দিন। অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে শিক্ষানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন নিয়ে এমন তাড়াহুড়োয় প্রশ্ন তুলেছেন গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষা আইন করার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। নানা প্রতিবন্ধকতায় সে আইনটি ১৫ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। এক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে ছিল বিতর্কিত নোট-গাইড ও কোচিং বাণিজ্য সম্পৃক্তরা। তারা আইনটি না হওয়ার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন। এর আগে দুবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং একবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে নানা অজুহাতে আইনের খসড়াটি ফেরত পাঠানো হয়। তবে এবার সেই খসড়াকে আধুনিকায়ন করে জনমত যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য। তবে বড় পরিসরে মতামত গ্রহণে মাত্র পাঁচ দিন সময় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রশ্ন-উত্তর সংবলিত গাইড বই প্রকাশ করা যাবে না। তবে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক সহজে বোঝার জন্য সরকার অনুমোদিত সহায়ক পুস্তক রাখা যাবে। এ ছাড়া কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণে আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সরকার। প্রস্তাবিত আইনে আরও থাকছে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ফেরাতে ন্যাশনাল এডুকেশন একাডেমি গঠন এবং এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ, প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নতুন প্রশাসনিক কাঠামো, র্যাগিং, শারীরিক নির্যাতন ও জাল সনদে চাকরিতে জেল-জরিমানা, ইংরেজি মাধ্যমেও বাংলা ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূলক এবং পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আইসিটি অন্তর্ভুক্তি।
খসড়া আইনে জাল সার্টিফিকেটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে দ্রুত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি, মানসিক নিপীড়ন, র্যাগিং ও বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও উচ্চশিক্ষায় নতুনত্ব আনতে অভিন্ন গ্রেডিং ও সমন্বিত গবেষণা পদ্ধতি চালুর বিধান রাখা হয়েছে।
মতামত প্রদানের জন্য আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রস্তাবিত এই খসড়াটি সর্বসাধারণের পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ওইদিন বিকেল ৫টার মধ্যে [email protected] ই-মেইলে যে কেউ মতামত ও পরামর্শ দিতে পারবেন। জমা পড়া যৌক্তিক পরামর্শগুলো বিবেচনা করেই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।