

অনিশ্চয়তা, সময়সূচির পরিবর্তন এবং রমজানের প্রভাবের মধ্য দিয়ে শেষ হলো অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। শেষ পর্যন্ত ১৮ দিনের এই মেলা পাঠক, প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের জন্য রেখে গেছে মিশ্র অভিজ্ঞতা। নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা এবং বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেক প্রকাশক। তবে ভিড় কম থাকায় পাঠক স্বস্তিতে বই কেনা ও মেলা ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছেন বলে জানালেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে শিশুপ্রাঙ্গণের নানা আয়োজন এবারের মেলাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
এবারের বইমেলা আয়োজনের শুরু থেকেই ছিল অনিশ্চয়তা। জাতীয় নির্বাচন এবং রমজান মাস ঘিরে সময়সূচি নিয়ে শুরুতে তৈরি হয় জটিলতা, মেলার তারিখ পরিবর্তন হয় তিন দফায়। শেষ পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৮ দিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সময় কম হওয়ায় অনেক প্রকাশক নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক ছিলেন। ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় নতুন বইয়ের সংখ্যা কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে এবারের মেলায় নতুন বই জমা পড়েছে মোট দুই হাজার সাতটি। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ, অনুবাদ সাহিত্য এবং শিশুতোষ বই। যদিও সংখ্যার দিক থেকে এটি আগের অনেক বছরের তুলনায় কম, তবু বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে মেলায় প্রকাশিত বইগুলো পাঠকদের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। নতুন লেখকদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের বইও পাঠকের নজর কেড়েছে।
বিক্রির ক্ষেত্রেও এবারের মেলায় রমজানের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। প্রকাশকদের অনেকেই জানিয়েছেন, রোজার সময় সন্ধ্যার পর মেলায় মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। অনেক স্টলে দিনভর পাঠক উপস্থিত থাকলেও সন্ধ্যার পর মেলার পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত ছিল। তবু বাংলা একাডেমির হিসাব অনুযায়ী এবারের মেলায় মোট বই বিক্রি হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকার।
এক প্রকাশক বলেন, এবারের অমর একুশে বইমেলা রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি ও বিক্রি—দুটোই আগের বছরের তুলনায় কম ছিল। অনেক স্টলেই প্রত্যাশিত বিক্রি হয়নি। সেই বাস্তবতায় বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে প্রায় ১৭ কোটি টাকার বই বিক্রির যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা অনেক প্রকাশকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তার মতে, এ হিসাব কীভাবে হয়েছে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। না হলে প্রকাশকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে।
তবে ভিড় কম থাকায় অনেক পাঠকের কাছে এবারের মেলা ছিল স্বস্তিদায়ক। স্টল ঘুরে বই দেখা, পছন্দমতো বই বেছে নেওয়া এবং লেখকদের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগও বেশি পাওয়া গেছে। পাঠকরা বলেছেন, অতিরিক্ত ভিড় না থাকায় ধীরেসুস্থে বই দেখার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যা বইপ্রেমীদের জন্য আনন্দের ছিল। পরিবার নিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রেও স্বস্তির পরিবেশ ছিল বলে জানিয়েছেন অনেকে।
এবারের মেলার অন্যতম প্রাণবন্ত অংশ ছিল শিশুপ্রাঙ্গণ। প্রতি ছুটির দিনেই ছিল শিশু-কিশোরদের সরব উপস্থিতি। পুতুলনাট্য, বায়োস্কোপ, গল্প বলা, আবৃত্তি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন ছোটদের কাছে মেলাকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। অনেক পরিবার তাদের শিশুদের নিয়ে মেলায় এসে এই আয়োজনগুলো উপভোগ করেছেন।
মেলার মূলমঞ্চেও প্রতিদিন আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান এবং সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সমকালীন নানা বিষয় নিয়ে এসব আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। লেখক, গবেষক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এসব আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, লেখক-পাঠক আড্ডা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল মেলার নিয়মিত আয়োজনের অংশ।
মেলার সার্বিক পরিবেশ নিয়েও অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো ছিল এবং দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে মেলা ঘুরে দেখতে পেরেছেন। খাবারের স্টল, বিশ্রামের জায়গা, তথ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবস্থাও ছিল মেলায়। তবে সময় স্বল্পতার কারণে অনেক প্রকাশক মনে করেন, মেলার সময় যদি আরও কিছুটা বেশি হতো, তাহলে নতুন বই প্রকাশ ও বিক্রি দুটোই আরও বাড়তে পারত।
বইমেলার সার্বিক আয়োজন নিয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম কালবেলাকে বলেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক উদ্যোগে আগামী বছরের বইমেলা নতুনরূপে প্রত্যাশা জাগাবে, এই আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি।
এদিকে বইমেলার সময়সূচি নিয়ে আগামী বছরগুলো নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সামনের কয়েক বছরেও রমজান ফেব্রুয়ারির সময়ের মধ্যে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বইমেলার আয়োজন কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতবিনিময় চলছে। অনেকেই মনে করছেন, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনার সঙ্গে অমর একুশে বইমেলার সম্পর্ক গভীর। তাই রমজানের সময় পড়লেও ফেব্রুয়ারি মাসেই বইমেলার আয়োজন রাখা উচিত। প্রয়োজনে সময়সূচি বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
সীমিত সময়, কিছু প্রতিবন্ধকতা এবং তুলনামূলক পাঠক উপস্থিতি কম হলেও এবারের অমর একুশে বইমেলা শান্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় আয়োজন ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও নতুন বইয়ের সংখ্যা ও বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। তবু পাঠক-লেখক-প্রকাশকদের মিলনমেলায় বইপ্রেমীদের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনা ধারণ করে প্রতি বছরের মতো এবারের বইমেলাও পাঠকের মনে রেখে গেছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।