

জামালপুরের ইসলামপুর পৌরসভার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিবি) একটি প্যাকেজে ব্যাপক অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে স্বল্পমূল্যের নির্মাণ সামগ্রী ও সড়কবাতি কিনে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার আর্থিক অসংগতির চিত্র সামনে এসেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪টি প্যাকেজে উন্নয়ন কাজের জন্য গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করে ইসলামপুর পৌরসভা, যার মধ্যে ১৩টি লটারি পদ্ধতিতে এবং ১৪ নম্বর প্যাকেজটি উন্মুক্ত কোটেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়। এই প্যাকেজে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে ৬৭০টি সড়কবাতি কেনার জন্য ৬ লাখ ৯ হাজার ৯৭৫ টাকা, ১৪০ মিটার ড্রেন স্ল্যাব নির্মাণে ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫১৮ টাকা এবং পলবান্ধা এলাকায় রাস্তা মেরামত ও পুকুরপাড়ে ব্লক বসানোর জন্য ১০ লাখ ৮২ হাজার ৩৩২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এ কাজের সঙ্গে জড়িত পৌরসভার কার্য সহকারী বুলবুল আহমেদের বিরুদ্ধে অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রায় ২৫ লাখ টাকার প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, পুকুরপাড়ে ব্লক বসানো ও সড়কবাতি কেনায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। যেখানে একটি ব্লকের বাজারমূল্য ১৯০ টাকা, সেখানে প্রতিটি ব্লকে ৩ হাজার ৯০০ টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে।
হাসান নামে এক ঠিকাদার জানিয়েছেন, ২৭৬টি ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে, যার মোট মূল্য ৫২ হাজার ৪৪৪ টাকা এবং সিমেন্ট, বালু ও শ্রমিক খরচসহ সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। অথচ হিসাবের কাগজে এর বিপরীতে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে।
পৌরসভার এক কর্মচারী বলেছেন, কোনো সড়কবাতি কেনা হয়নি এবং পুরো টাকাই লোপাট করা হয়েছে। তার মতে, সব বাতি কিনলেও ৬০ টাকার একটি বাতির দাম ৯১০ টাকা দেখানো হয়েছে, যেখানে ব্যবহৃত বাতিগুলোর বাজারমূল্য ৬০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। ৬৭০টি সড়কবাতির জন্য প্রকৃত ব্যয় ৪০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা হওয়ার কথা।
একইভাবে ১৪০ মিটার স্ল্যাব নির্মাণে গুণগত মান নিশ্চিত করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা থাকলেও নিম্নমানের ও পরিমাণে কম স্ল্যাব ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মচারীর হিসাব অনুযায়ী, ব্লক বসাতে অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ, সড়কবাতিতে ৫ লাখ এবং স্ল্যাব নির্মাণে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
জামালপুর শহরের ঝিলিক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে তৈরি ১২ ওয়াটের এসব বাতি পাইকারি দামে ৬০ টাকায় পাওয়া যায়। ছবিতে যে কোম্পানির বাতি দেখা যাচ্ছে সেগুলো ১২০ টাকায় নেওয়া সম্ভব।’
পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পলবান্ধা ভাটিপাড়া, ধর্মকূড়া বাজার, কিংজাল্লা ও নটারকান্দায় বেশিরভাগ সড়কবাতি পুরোনো এবং অনেক জায়গায় বাতি জ্বলে না। কোথাও কোথাও নতুন বাতি লাগানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাটনীপাড়ার মুক্তার মিয়া বলেন, ‘গত এক বছরে এ এলাকায় নতুন বাতি লাগানো হয়নি।’ কিংজাল্লার চা দোকানি আফসর বলেন, ‘আমরা নতুন বাতি লাগাতে দেখিনি।’
যার পুকুরপাড়ে ব্লক বসানো হয়েছে সেই পুকুরের মালিক লিটন বলেন, ‘পুকুরের অর্ধেক অংশে ব্লক বসানো হয়েছে, গাইডওয়াল আগেই ছিল। এত বাজে কাজ করেছে যে, বর্ষায় এগুলো ধসে পড়বে।’ ধর্মকুড়া বাজারের আব্দুল আজিজ বলেন, ‘এখানে কয়েকটি স্ল্যাব বসানো হয়েছে, এগুলো নিম্নমানের এবং বসানোর সময়ই ভেঙে গেছে।’
পৌরসভা প্রকৌশল সূত্র জানায়, এমএমসি-এমকেটি জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে আলাল উদ্দিন নামে এক স্থানীয় ঠিকাদার কাজটি সম্পন্ন করেন। তবে ঠিকাদারি লাইসেন্সের মালিক আলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কিছু বলতে পারব না, যা জানার অফিস থেকে জেনে নিন।’ তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই প্যাকেজের কাজ বাস্তবে করেছেন পৌরসভার কার্য সহকারী বুলবুল আহমেদ, যিনি ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন। এর আগেও তিনি একইভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি লাইসেন্স ব্যবহারের কথা স্বীকার করেননি। তবে কাজের অনিয়মের দায় স্বীকার করে বলেন, ‘কাজে অনিয়ম হলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।’
এ বিষয়ে ইসলামপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ‘কাজ সঠিকভাবে হয়েছে এবং কাজ দেখে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।’ অন্যদিকে পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি জেনে পরে মন্তব্য করবেন বলে জানান।