আদর শর্মা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৩২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
শতবর্ষী জেএম সেন ভবন

আগাছার আড়ালে গৌরবের ইতিহাস

শতবর্ষী জেএম সেন ভবন। ছবি : কালবেলা
শতবর্ষী জেএম সেন ভবন। ছবি : কালবেলা

চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী জেএম সেন ভবন। একসময় এ বাড়ি ছিল ভারতীয় কংগ্রেস নেতা যাত্রামোহন সেনগুপ্তের পৈতৃক ভিটে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির ভাঙা দরজা, খসে পড়া দেয়াল আর আগাছায় ভরা আঙিনা যেন ঢেকে রেখেছে তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তবু কাঠের সিঁড়ির সূক্ষ্ম শৈলী আর দরজার কারুকাজ এখনো প্রমাণ করে, এটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়।

সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের সামনের অংশে আগাছা ও ঘাস, ভাঙা দরজা, খসে পড়া দেয়াল—সময়ের ক্ষয় স্পষ্ট। লাল দাগে দেখা যায়, একসময় এটি ভাঙার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল।

জানা যায়, ১৮৯২-৯৩ সালে নির্মিত এ ভবন একসময় ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। যাত্রামোহন সেনগুপ্তের ছেলে সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতা যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ছিলেন কলকাতার মেয়র। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎ বসু, মোহাম্মদ আলী, শওকত আলীসহ অসংখ্য প্রখ্যাত নেতা এখানে এসেছেন। চট্টগ্রামের যুববিদ্রোহ, বার্মা অয়েল কোম্পানি আন্দোলন, চা শ্রমিকদের মুল্লুক চলো আন্দোলন ও আসাম-বেঙ্গল রেল ধর্মঘটের অদৃশ্য স্মৃতি এখনো লেগে আছে ভবনের দেয়ালে।

১৯৩৩ সালে যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত কারারুদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার স্ত্রী নেলী সেনগুপ্ত ১৯৭০ পর্যন্ত রহমতগঞ্জের এ বাড়িতে ছিলেন। পরে তিনি ভারতে চিকিৎসার জন্য যান এবং ফিরে এসে দেখেন, বাড়িটি দখল হয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে জমির একাংশ ‘শত্রু সম্পত্তি’ ঘোষণা করা হয় এবং জেলা প্রশাসন শামসুদ্দিন মো. ইছহাককে ইজারা দিয়ে শুরু হয় ‘বাংলা কলেজ’। পরে নাম বদলিয়ে একই ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয় শিশুবাগ স্কুল, যেখানে বহু শিশু শিক্ষার আলো পায়।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে আবারও জমি দখলের চেষ্টা হয়। বুলডোজার নিয়ে এগোতে থাকলে স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই প্রতিরোধের সাক্ষ্য আজও বহন করছে ভবনের ভাঙা দরজা আর আগাছা।

যাত্রামোহন সেনগুপ্তের উত্তরসূরি লিটন সেনগুপ্ত কালবেলাকে বলেন, আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সম্মান পাওয়ার স্বপ্ন ছিল; কিন্তু জমি দখল আর আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি অধরাই রয়ে গেছে। পৈতৃক ভিটে ফিরে পাওয়াই একমাত্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি এখন পৈতৃক ভিটেবাড়ি চন্দনাইশের বৈলতলী রোডের সেনবাড়িতে বসবাস করছেন।

যাত্রামোহন সেনগুপ্তের পাঁচ ছেলে যতীন্দ্র, ফনিন্দ্র, দ্বীজেন্দ্র, বীরেন্দ্র ও নরেন্দ্র। বীরেন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মিলন সেনগুপ্ত ছিলেন পরিবারের একমাত্র উত্তরসূরি। লিটনের বাবা মিলন সেনগুপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর মারা যান। মৃত্যুর পর শ্মশানে দাহ করতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল। মামলা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হয়। লিটন অভিযোগ করেন, কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী গোষ্ঠী এখনো জমি দখল করে রেখেছে।

রহমতগঞ্জ মৌজার ৩৮৬ খতিয়ানের ১০৯৬ দাগে জেএম সেন ভবনের মোট জমি ৩৮ শতক। এর মধ্যে ২৩ শতক ‘অর্পিত সম্পত্তি’, আর ১৫ শতক শিশুবাগ স্কুলের নামে।

১৯৬৮ সালে শামসুদ্দিন ইছাক স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাতি শিশুবাগ স্কুলের সহকারী শিক্ষক তাহসিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ১৯৬৬ সালে আমার নানা বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। বিকেলে চলত ওই কলেজ। পরে ১৯৬৮ সালে শিশুদের জন্য চালু করেন শিশুবাগ স্কুল, যা ২০২০ সাল পর্যন্ত নিজস্ব জায়গায় চলেছে। ২০২১ সালে ভূমিদস্যুরা ভুয়া ডিক্রি দেখিয়ে দখলের চেষ্টা করে। নিম্ন আদালতে ডিক্রি দুবার খারিজ হলেও মামলা এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন। বর্তমানে স্কুলটি ভাড়া করা ভবনে চলছে, যেখানে শিক্ষার্থী নেমে এসেছে ২০০-২৫০ জনে। মাঠ না থাকায় কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম কালবেলাকে বলেন, জেএম সেন হলকে আমরা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর। ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখিয়ে জমি দখলের আবেদন একে একে খারিজ করেছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঝুঁকি ঠেকাতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ভবনটিকে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে রয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা মিলন সেনগুপ্তের পরিবার চাইলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মোছা. নাহিদ সুলতানা জানান, প্রাথমিকভাবে ভবনটি পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিবেদন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও দুমাস সময় লাগতে পারে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ষাটের দশকের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জেএম সেন ভবন। সরকার এটি সংরক্ষণ করলে চট্টগ্রামের সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হতে পারত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও গবেষক আলীউর রহমান কালবেলাকে জানান, ভবনটি হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এরই মধ্যে সংরক্ষণের নকশা তৈরি করেছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে এ ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র জাপানের

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি সম্পন্ন, নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা সম্পন্ন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা

জাপানের দুর্দান্ত জবাব, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সমতায় ফেরা

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লিতে প্রবেশে বাধা, ফয়েজের ফেসবুক স্ট্যাটাস

সেভেন আপের দুঃসহ স্মৃতি : ১২ বছর পর ‘বন্ধু’ পেল ব্রাজিল

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে ‘রহস্যজনক কারণে’ দিল্লিতে প্রবেশে বাধা

মাঠে মুখোমুখি নেদারল্যান্ডস-জাপান

ভোলায় মাছসহ ৩ জেলে আটক

ব্রাজিলের সেই ‘সেভেন আপ’ এর স্মৃতি ফেরাল জার্মানি

১০

জার্মানির গোলবন্যা, কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত

১১

৫–১ গোলে এগিয়ে গেল জার্মানি

১২

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-শিবিরের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা

১৩

রাশিয়া যাওয়ার দেড় মাসের মধ্যে নিখোঁজ মফিজ মিয়া, ড্রোন হামলায় নিহতের গুঞ্জন

১৪

যে কারণে নেতানিয়াহুকে নির্বোধ বললেন ট্রাম্প

১৫

পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ, গাড়িচাপা দিয়ে যুবককে হত্যাচেষ্টা

১৬

চুরির অভিযোগে চোরকে মারধর, ভিডিও ভাইরাল

১৭

মাহমুদা লাবনীর গুচ্ছ কবিতা

১৮

দুই এমপিকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরালেন মমতা

১৯

এমপি মনিরুল হকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত: সর্ব মিত্র চাকমা

২০
X