

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুধু বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষও দীর্ঘকাল ধরে এ উৎসব পালন করে আসছে। যদিও বাঙালি হিন্দু সমাজে শারদীয় দুর্গাপূজা সর্ববৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব, তবে হিন্দুধর্মাবলম্বী সব জনগোষ্ঠীর কাছে এটি সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবুও কয়েক শতাব্দী ধরে দুর্গাপূজা অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। যদিও তাদের পূজা পালনের রীতিনীতিতে রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতির অনন্য ছাপ।
মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী হিন্দুরাই সবচেয়ে জাঁকজমকভাবে দুর্গাপূজা পালন করেন। পাশাপাশি নেপালেও এ উৎসব ব্যাপকভাবে আয়োজিত হয়। বাংলাদেশে দুর্গাপূজা মূলত বাঙালি হিন্দু সমাজেই সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে পরিচিত হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সিলেট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ১৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যেও দুর্গাপূজার প্রচলন রয়েছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্যমতে, ত্রিপুরা, হাজং, বানাই, ওরাওঁ, মাহাতো, পাত্র, কোচ, বর্মন, গঞ্জু, ডালুসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দুর্গাপূজা পালন করেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতা সঞ্জীব দ্রং জানান,
বাংলাদেশে বাঙালিদের বাইরে যারা দুর্গাপূজা বড়ভাবে পালন করেন, তারা সবাই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। একসময় এরা প্রকৃতিপূজারি ছিলেন। কেউ সূর্য, কেউ গাছ, কেউ ধান, কেউবা মনসাকে পূজা করতেন। কিন্তু ঔপনিবেশিক আমল থেকে এ অঞ্চলের বহু নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্গাপূজা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু হয় এবং ক্রমে তা তাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ধর্মীয় আচার বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে অভিন্ন নয়। তারা দুর্গাপূজা করেন, কিন্তু তা হয় তাদের নিজস্ব রীতি ও সংস্কৃতির আলোকে। ফলে একই দেবী পূজা হলেও এর রূপ, মণ্ডপ, পোশাক, মন্ত্রপাঠ, বিসর্জনসহ নানা ক্ষেত্রে পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
তবে ২৫ থেকে ৩০ বছরে পরিবর্তনের ছাপও স্পষ্ট। অনেক নৃগোষ্ঠীর দুর্গাপূজায় এখন বাঙালি হিন্দুদের পূজার আয়োজনের প্রভাব পড়েছে। মণ্ডপ, প্রতিমা, সাজসজ্জা—সবকিছুতে আড়ম্বর ও আধুনিকতা বেড়েছে। তবু তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে আগত উপাদানগুলো এখনো অটুট রয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্গাপূজা পালনের রীতি চালু হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে বানাই সম্প্রদায়ের মতে, তারা ১৭৫৭ সালের আগেই দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়
বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ত্রিপুরা বসবাস করেন, যাদের বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে। তারা দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপূজা পালন করছেন। আগে বাঙালি ব্রাহ্মণ পুরোহিত এনে মন্ত্রপাঠ করানো হতো, এখন নিজেদের সম্প্রদায়ের প্রশিক্ষিত পুরোহিতরাই পূজার আচার সম্পন্ন করেন। প্রতিমার সাজেও এসেছে পরিবর্তন—দেবীদের এখন বাঙালি শাড়ি নয়, বরং ত্রিপুরা নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই-রিসা পরানো হয়। পূজা উপলক্ষে নতুন পোশাক বোনাও একটি উৎসবমুখী আচার।
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা জানান, মূলধারার বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপূজা পালনের সঙ্গে ত্রিপুরাদের দুর্গাপূজা পালনের তেমন একটা পার্থক্য নেই।
হাজং সম্প্রদায়
সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হাজং জনগোষ্ঠীর ১০ হাজারের মতো সদস্য রয়েছেন।
ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের কৃষিভিত্তিক সমাজে বসবাসকারী হাজংরা দুর্গাপূজা পালন করলেও এটি তাদের প্রধান উৎসব নয়। তাদের মূল উৎসব হলো দেউলী পূজা; ধান কাটার মৌসুমে আয়োজিত এ উৎসবে কাদা খেলা, পানি খেলা এবং নানা লোকায়ত আনন্দের আয়োজন থাকে। মনসা পূজাও হাজংদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপূজার সময় তারা নিজেদের পুরোহিত ব্যবহার করেন এবং মণ্ডপও আলাদা ধাঁচে তৈরি হয়।
নেত্রকোনার বিরিশিরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালক সুজন হাজং জানান, দুর্গাপূজা করলেও তার সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের সংস্কৃতি অনুযায়ী কিছুটা ভিন্নভাবে দুর্গাপূজা উৎসব পালন করেন।
বানাই সম্প্রদায়
সাভার, গাজীপুর, শ্রীপুর অঞ্চলে বাস করা বানাইরা বহু আগে থেকেই দুর্গাপূজা পালন করে আসছে। ইংরেজ শাসন শুরু হওয়ার আগে তারা দুর্গাকে পূজা করা শুরু করে। বর্তমানে প্রতিমায় বানাই নারীর পোশাক পাথিন পরানো হয়। বিসর্জনের পর তাদের বিশেষ আনন্দ আয়োজন প্যাক খেলা—এক ধরনের কাদা খেলা।
এই নৃগোষ্ঠীর নেতা রিপন বানাই জানান, তার সম্প্রদায়ের মানুষরা এক সময় কেবলই প্রকৃতির পূজারি ছিল। কিন্তু পরে তারা দুর্গাকে পূজা শুরু করে। পূজার সময় দুর্গা দেবীকে এখন বানাই নারীর পোশাক ‘পাথিন’ পরানো হয়।
পাত্র সম্প্রদায়
সিলেট অঞ্চলের পাত্র নৃগোষ্ঠীর দুর্গাপূজার নাম খেমুং লারাং। তারা মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে থেকে দুর্গাপূজা পালন শুরু করে। এখানে মন্ত্রপাঠ হয় পাত্র ভাষায়, সংস্কৃতে নয়। তাদের পূজার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে হাঁস বলি অন্যতম।
ওরাওঁ সম্প্রদায়
প্রকৃতিপূজক ওরাওঁরা মূলত কারাম উৎসবকেই প্রধান বলে মনে করে। তবে তারা দুর্গার দুর্গতিনাশিনী রূপেরও পূজা করে। কৃষিনির্ভর জীবনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তারা ফসল রক্ষা ও রোগবালাই থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন আচার পালন করে থাকে।
কোচ সম্প্রদায়
কোচরা দুর্গাপূজার পাশাপাশি কালীপূজা ও সরস্বতী পূজাও পালন করে। এ সম্প্রদায়ের মধ্যেও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য দেখা যায়।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো দুর্গাকে মূলত শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করে থাকে। যদিও তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বাঙালি হিন্দুদের মতো নয়, তবুও দুর্গাপূজা তাদের কাছে জীবনের সংকট মোকাবিলা, রোগ-শোক থেকে মুক্তি এবং সামাজিক মিলনমেলার অন্যতম উপলক্ষ। সূত্র : বিবিসি বাংলা।