

নির্বাচন সামনে রেখে দুই দফায় ২৭২ আসনে দলের প্রার্থী ঘোষণা করার পর ‘ক্ষুব্ধ’ শরিকদের নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে বিএনপি। গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই বিএনপির একতরফাভাবে প্রার্থিতা ঘোষণার বিষয়টি যে শরিকরা ভালোভাবে নেয়নি, সেটি তারা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে মিত্ররা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তারা একসঙ্গে রাজপথে ছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, সরকারি প্রলোভনও গ্রহণ করেননি; কিন্তু আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে বিএনপির তরফ থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার যে বিষয় ছিল, সেটি তারা খুঁজে পাননি। তারা আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী কিছুদিন ধরে তাদের বন্ধুর সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী দিনে যেখানে যুগপতের মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার, সেখানে বিএনপি মিত্র হারানোর পথে হাঁটছে; এটি জোটের ঐক্যের জন্য মোটেই শুভ নয়।
এ অবস্থায় নির্বাচন সামনে রেখে অবিলম্বে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য তাগিদ দেন মিত্ররা। শরিকদের এমন ক্ষোভ ও তাগিদের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর এই দুদিন যুগপৎ আন্দোলনের জোট ও দলগুলোর সঙ্গে আলাদা করে বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বিএনপি। বিএনপি ও মিত্রদের প্রত্যাশা, ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে আসন সমঝোতাসহ অন্য ইস্যুগুলোর সন্তোষজনক সুরাহা হবে। বৈঠক সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। অন্যদিকে, শরিক দল ও জোটের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গণতন্ত্র মঞ্চের সাইফুল হক, জোনায়েদ সাকি, শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, তানিয়া রব ও শহীদুল্লাহ কায়সার; ১২ দলীয় জোটের মোস্তফা জামাল হায়দার, সৈয়দ এহসানুল হুদা ও আহসান হাবিব লিংকন; জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গোলাম মওলা চৌধুরী, খন্দকার লুৎফর রহমান, এসএম শাহাদাত; গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের আবুল কালাম আজাদ, গণফোরামের জগলুল হায়দার আফ্রিক, গণঅধিকার পরিষদের ফারুক হাসান ও রাশেদ খান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মাওলানা একেএম আশরাফুল হক প্রমুখ।
বিএনপি ২০১৮ সালে শরিকদের জন্য ৫৯টি আসন ছেড়েছিল। সেবার জামায়াতকে ২২টি আসন ছাড়লেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনে দলটি এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই শরিকদের জন্য বিএনপির এবার আসন ছাড়ের সংখ্যা কমে ১৫-তে দাঁড়াতে পারে। জানা গেছে, আসন সমঝোতা প্রশ্নে সংশোধিত আরপিওর বিষয়টি ভাবাচ্ছে বিএনপিকে। কারণ, আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনে নিবন্ধিত একাধিক দল জোটভুক্ত হলেও ভোট করতে হবে নিজ নিজ দলের প্রতীকে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী এবং আরপিও বিবেচনায় নিয়ে শুধু বিজয়ী হতে পারার মতো শরিকদেরই আসন ছাড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। অবশ্য ‘যৌক্তিকভাবে’ জোটের ঐক্য অটুট রাখতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দলটি। তাই মিত্রদের যাদের মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের সংসদের উচ্চকক্ষসহ ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়নের চিন্তা রয়েছে বিএনপির।
নির্বাচন সামনে রেখে এখন পর্যন্ত দুই দফায় মোট ২৭২ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে বিএনপি। ফলে ফাঁকা রয়েছে আরও ২৮ আসন। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, এই ফাঁকা আসনগুলোতে মূলত শরিকরাই নির্বাচন করবেন। অবশ্য জোট নেতাদের অভিযোগ, বিএনপির চাওয়া অনুযায়ী দল ও জোটের প্রার্থী তালিকা জমা দিলেও তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি আসনে ‘অনিবন্ধিত’ দল ও জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু তাদের কাউকে আসন ছাড়েনি বিএনপি। এ অবস্থায় করণীয় নির্ধারণে গত বুধবার শিশুকল্যাণ পরিষদে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম এবং একটি ইসলামী দলসহ মোট ২৯টি দল বৈঠকে বসে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আসন সমঝোতা ইস্যুতে মিত্রদের নিয়ে কী ভাবছে, সেটা স্পষ্টভাবে বিএনপির কাছে জানতে চাওয়া হবে। তারপর তারা তাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন। বৈঠকে অধিকাংশ নেতা অভিমত দেন, উচ্চকক্ষ নয়, তারা সরাসরি নির্বাচন করে এমপি হতে চান। তারা বিএনপির কাছে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন চান, এটা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়।
গতকালের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার শুরুতে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক বেশ কয়েকটি পয়েন্টে কথা বলেন। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য ধরে রাখার পক্ষে তিনি মত দেন। দ্বিতীয়ত, তপশিল ঘোষিত হওয়ায় দ্রুত দল ও জোটগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ার বিষয়টিতে সমঝোতা করার কথা বলেন।
জানা গেছে, বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চের এক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা যুগপৎভাবে রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে তারা সেখান থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। প্রধান শরিক বিএনপির উচিত, ঐক্য ধরে রেখে সামনে অগ্রসর হওয়া। জামায়াত যেখানে শক্তি বৃদ্ধি করতে মিত্র বাড়াচ্ছে, সেখানে বিএনপি বন্ধুর সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করছে। বিএনপির কাছে জোটের প্রার্থীদের তালিকা দেওয়ার পর বলা হয়েছিল, বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই দুই দফায় ২৭২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হলো।
মঞ্চের অন্য এক নেতা বলেন, ডানপন্থিরা জামায়াতের নেতৃত্বে একটা বৃহত্তর ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলেছে, যদিও সেটা ধর্মভিত্তিক। অন্যদিকে, আমরা যারা জাতীয়তাবাদী শক্তি বা প্রগতিশীল শক্তি, আমাদের ঐক্য আছে কি নেই, মানুষ বিভ্রান্ত। জামায়াতের নেতৃত্বে ডানপন্থিদের উত্থান রুখতে হলে বড় অংশীদার হিসেবে বিএনপির উচিত হবে জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজনীতি করা, মানুষ তাতে আকৃষ্ট হবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক নেতা বলেন, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা হোক বা না হোক, সেটি পরের কথা। কিন্তু এলাকায় তারা তাদের দলের প্রচারণাও ঠিকভাবে করতে পারছেন না। প্রচারণাকালে তারা বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন। অবিলম্বে এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া দরকার।
১২ দলীয় জোটের এক নেতা বলেন, কোনো কিছু না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়াও ভালো। দেরিতে হলেও আমরা যে বসতে পেরেছি, এটা একটা অগ্রগতি, যদিও আগেই বসা উচিত ছিল। এখন এই বৈঠকটাকে আমরা যদি সফল করতে পারি, আমাদের অন্তরে যতই কষ্ট-আঘাত-ব্যথা থাক, আমরা এটা ওভারকাম করতে পারব।
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অতীতে একসঙ্গে যাদের নিয়ে আন্দোলন করেছে, তাদের নিয়ে আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়ার এবং পথ চলার কথা বলেন। তিনি বলেন, চলার পথে সমস্যা থাকবে, সমাধানও আছে। আমরা আজকে বসতে পারলাম, এটা বড় অগ্রগতি। কিন্তু ২৯টি দলকে একত্রে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে না, সম্ভবও না। এজন্য শরিক দল ও জোটের সঙ্গে আমরা আলাদাভাবে বসব। যার যে সমস্যা, আমরা একান্তে আলোচনা করে সমাধান করার চেষ্টা করব। প্রচারণায় বাধা প্রসঙ্গে শরিকদের আশ্বস্ত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সামনে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে ব্যাপারে তারা সতর্ক থাকবেন। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানতে চাইলে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক সাইফুল হক কালবেলাকে বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে যে ঐক্যটা গড়ে উঠেছিল, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই গোটা পর্যায়জুড়ে ঐক্যটাকে ধরে রাখা দরকার। আশা করি, প্রধান শরিক হিসেবে বিএনপি এ ব্যাপারে সচেষ্ট হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈঠকে কেউ কেউ তাদের আসন নিয়ে কথা বলেছেন। তবে আসন ধরে ধরে কোনো আলোচনা হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে দলগত বা জোটগতভাবে আলাদা আলোচনা হবে। আমরা আশা করি, চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সুযোগ হবে। এই দুদিনে নির্বাচনী আসন সমঝোতার ব্যাপারটাতে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, একটা বোঝাপড়ার জায়গায় আসা যাবে।