

দেশে গত এক দশকে তরুণদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল গণঅধিকার পরিষদ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে আসা দলটি তরুণদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল খুব দ্রুতই। আরেক কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর সেটা অনেকটাই স্তম্ভিত হতে থাকে। এরই মধ্যে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে দলটি। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির মধ্যে ফের ভাঙনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিএনপির সঙ্গে দুই সিটের আসন সমঝোতা ও রাশেদ খানের পদত্যাগ ইস্যুতে বেসামাল অবস্থায় দলটি। নেতাকর্মীরা বলছেন, গণঅধিকার পরিষদ ফাঁদে পড়তে পারে।
কয়েকদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল রাশেদ খান ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। গতকাল শনিবার সেই গুঞ্জনই সত্যি হলো। শুধু তাই নয়, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে তিনি বিএনপিতেই যোগ দিয়েছেন। গতকাল গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে দলটিতে যোগ দেন। বিএনপিতে যোগদান অনুষ্ঠানে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মো. রাশেদ খান ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করবেন। আপনারা সবাই দলের পক্ষ থেকে রাশেদ খানকে সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।
এর আগে এদিন সকালে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন রাশেদ খান। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, ‘ব্যক্তিগত কারণে এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে আমি দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছি। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যারা আমার সহযোদ্ধা ছিলেন, তাদের কেউ আমার আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি ক্ষমা প্রার্থী। যেখানেই থাকি, আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট থাকবে।’
দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, রাশেদ খান গণঅধিকারের দায়িত্বে থাকলেও সব সময়ই বিএনপিমনা ছিলেন। নিজ দলের রাজনীতির চেয়ে তিনি বিএনপির রাজনীতিই বেশি করতেন। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে খুব বেশি ভালো সম্পর্কও ছিল না তার। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দল থেকে পদত্যাগ করে দলকে খাদে ফেলে দিয়েছেন তিনি।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য আব্দুজ জাহের কালবেলাকে বলেন, রাশেদ খান গণঅধিকারের রাজনীতি কখনোই করেননি। তাকে হয়তো এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। তার তোষামোদির রাজনীতির কারণে গণঅধিকার আজ খাদের কিনারে। তার অপকৌশল বুঝতে পেরে আমি অনাস্থা প্রস্তাব করেছিলাম। এমন এক সময় রাশেদ খান পদত্যাগ করলেন, যখন আর আমাদের কিছুই করার নেই। এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত হতে পারে।
রাশেদ খানের পদত্যাগ ইস্যুতে নুরুল হক নুর জানিয়েছিলেন, তাকে নির্বাচনে জয়লাভের কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপিতে যোগদান এবং ধানের শীষে নির্বাচন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কৌশল বলা হলেও রাশেদ খান যদি নির্বাচনে জিতে যান, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে তিনি আর গণঅধিকারে ফিরতে পারবেন না। যদিও নেতারা বলছেন, রাশেদ খানের গণঅধিকারে ফেরার তেমন কোনো ইচ্ছাও নেই। তিনি বিএনপির রাজনীতিই পছন্দ করেন।
গণঅধিকার সূত্র বলছে, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে দল এখন তিন ভাগে বিভক্ত। একটি পক্ষ এক সিটের বিনিময়ে হলেও বিএনপির সঙ্গে থাকতে চায়, দলের বড় অংশ এখনো একক নির্বাচনের পক্ষেই। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও চলছে। অন্য একটা পক্ষ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া তৃণমূলে বিষয়গুলো নিয়ে বেশ হতাশা ও ক্ষোভ দেখা গেছে। কয়েকজন নেতাকর্মী এই ইস্যুতে পদত্যাগও করেছেন। গণঅধিকার পরিষদ শরীয়তপুর জেলা কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. জুয়েল বেপারি গতকাল ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
গণঅধিকার পরিষদের সহসভাপতি ফারুক হাসান কালবেলাকে বলেন, আমরা সবাই একক নির্বাচনের পক্ষেই ছিলাম। জোটগতভাবে হলে সেটি হতে হবে সম্মানজনক, কোনোভাবেই দুই সিটের বিনিময়ে নয়। শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে তা দলের সিদ্ধান্তে হয়নি।
রাশেদ খানের পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনীতিতে দোদুল্যমান থাকা ভালো নয়। তার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। তবে আরও আগে এই সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারতেন। এমন সময় সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের বড় ধাক্কা দিয়ে গেলেন।
রাশেদ খানের পদত্যাগের পর শূন্য হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদ। এই পদে কে আসবেন, তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে চলছে আলোচনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন এবং সহসভাপতি ফারুক হাসান এই পদে আগ্রহী।
দলের সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, নেতাকর্মীদের চাওয়া, ভোটাভুটির মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কথা। বাকিটা দল সিদ্ধান্ত নেবে।
বিএনপির পক্ষ থেকে দলের সভাপতি নুরুল হক নুরকে মন্ত্রিত্বসহ চারটি বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে সমঝোতা সত্ত্বেও গণঅধিকার পরিষদ তাদের নিজস্ব প্রতীক ট্রাক নিয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বিষয়টি জানিয়ে গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা হয়েছে দুটি আসনের। এ ছাড়া আমাদের দলীয় প্রধান নুরুল হক নুরকে মন্ত্রিত্ব এবং উচ্চকক্ষে একটি আসন ও সংরক্ষিত একটি নারী আসন দেওয়ার সমঝোতা হয়েছে। আমরা ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করব। ৩০০ আসনে আমাদের প্রার্থী থাকবে। সবাই ট্রাক প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। রাশেদ খানের সিদ্ধান্তটি একান্তই তার। কী কৌশল হিসেবে তাকে সভাপতি অনুমতি দিয়েছেন, সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
বিএনপিতে যোগ দিয়ে রাশেদ খান বলেন, ‘আমি বলতে চাই, বিএনপি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই করছে। আমি মনে করি, নতুন বাংলাদেশ গঠনে তারেক রহমানের নেতৃত্ব দেশ ও জনগণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি সংস্কার, বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। আমি বিএনপিতে যোগ দিয়েছি এবং দেশ ও জনগণের জন্য সংগ্রাম করে যাব।’