কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মুখোমুখি ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র

দ্বীপ নিয়ে বিরোধ
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মুখোমুখি ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র

গ্রিনল্যান্ড দখলে বাধা দিলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ হুমকিকে ‘বিপজ্জনক’ উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউরোপের নেতারা। এ শুল্ক আটলান্টিকের উভয় পাড়ের দেশগুলোর সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে বলে তারা সতর্ক করেছেন। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয়পক্ষের অনড় অবস্থান সামরিক জোট ন্যাটোকে হুমকিতে ফেলবে।

ট্রাম্পকে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ থেকে বিরত রাখতে প্রচেষ্টা বাড়ানোর ব্যাপারে বিস্তৃত সমঝোতায় পৌঁছেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূতরা। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের শুল্ক বলবৎ হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে।

ট্রাম্প শনিবার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করা ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ের পণ্যে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আলোপের ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড কেনা পর্যন্ত এ শুল্ক বহাল থাকবে বলেও তিনি জানান। রয়টার্স বলছে, প্রভাবশালী ইইউ দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ আখ্যা দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপের কী কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা নিয়ে বৃহস্পতিবার জরুরি সম্মেলনে বসার কথা রয়েছে ইইউ নেতাদের। তাদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে থাকতে পারে—যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ৯ হাজার ৩০০ কোটি ইউরোর পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ, ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষে যা আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু হতে পারে।

অন্য যেসব বিকল্পের কথা ভাবা হচ্ছে, তার মধ্যে আছে কখনো কাজে না লাগানো ‘জোর-জবরদস্তিবিরোধী ব্যবস্থা’ বা ‘অ্যান্টি-কোয়েরশন ইন্সট্রুমেন্ট’ (এসিআই) সক্রিয় করা, যা সরকারি দরপত্র, বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সীমিত করবে বা ডিজিটালসহ সব ধরনের সেবা খাতমূলক বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ, যে খাতে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক লাভ থাকে। তবে প্রাথমিকভাবে এসিআইর তুলনায় পাল্টা শুল্ক আরোপেই বেশিরভাগ দেশের পক্ষপাত দেখা যাচ্ছে। ইইউ সূত্র বলছে, এসিআইর ক্ষেত্রে ‘মিশ্র ভাবনা’ রয়েছে।

দাভোসে সংলাপ: ইইউ সম্মেলনগুলোয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করা ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ইইউ সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তারা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে সহায়তা দিতে দৃঢ় অঙ্গীকার এবং যে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।

বুধবার এ-সংক্রান্ত বিষয়ে মতবিরোধ নিয়ে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড একটি ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করেছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে নরওয়ে সফররত ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকি রাসমুসেন বলেছেন, ডেনমার্ক কূটনীতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সংলাপেই যে ইইউ বেশি জোর দিচ্ছে, তার খানিকটা প্রমাণ মিলবে এবারের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামেও। সেখানে বুধবার ট্রাম্পের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে, ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম তিনি ওই সম্মেলনে হাজির হচ্ছেন।

ইইউর এক কূটনীতিক বলেন, ‘সব বিকল্প খোলা রয়েছে। দাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পর নেতারা আবার একত্রিত হবেন।’

যে আট দেশের পণ্যের ওপর ট্রাম্প ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন শুল্ক আরোপের কথা বলছেন, তারা আগে থেকেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মার্কিন শুল্কের মধ্যে রয়েছে। ডেনমার্কের বিস্তৃত আর্কটিক দ্বীপটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধের পর এই দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে সীমিত আকারে সেনাও পাঠিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ঝুঁকিতে: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এসিআই চালু করার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তবে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকল মার্টিল বলেছেন, ইইউর পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু যে ব্যবস্থা আগে কখনো ব্যবহারই হয়নি, তা চালু করা ‘খানিকটা অকালপক্বই’ হবে।

অন্য ইইউ নেতাদের চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলক সুসম্পর্ক থাকা ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি রোববার ওয়াশিংটনের শুল্ক হুমকি ‘ভুল পদক্ষেপ’ আখ্যা দিয়েছেন। নিজের ভাবনার কথা ট্রাম্পকে জানিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

নতুন শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন কী করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিটিশ সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা নন্দী বলেছেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের কাজ করা জরুরি। তিনি স্কাই নিউজকে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হচ্ছে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো দরকষাকষি চলবে না। আমাদের সম্মিলিত স্বার্থ হলো— একসঙ্গে কাজ করা এবং কথার লড়াই শুরু হতে না দেওয়া।’

ট্রাম্পের এই নতুন শুল্ক হুমকি গত বছর মে ও জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিস্তৃত শুল্ক বহাল রাখছে, অন্যদিকে তাদের অংশীদারদের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে হচ্ছে—এমন সামঞ্জস্যহীনতার কারণে সেসব চুক্তি আগে থেকেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছিল।

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের গতিপ্রকৃতি বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ চুক্তি নিয়ে কাজ স্থগিত করার দিকেই এগোচ্ছে। ইইউতে আমদানি হওয়া অনেক পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার নিয়ে ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি ওই পার্লামেন্টে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল, ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির প্রধান মানফ্রেড ভেবার শনিবার বলেছেন, এখনই ওই শুল্ক প্রত্যাহার অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

জার্মান ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ইয়ুর্গেন হার্ট খবরের কাগজ বিল্ডকে বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হুঁশে ফেরাতে’ সর্বশেষ আরেকটি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছেন তারা। সেটি হলো—এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল বয়কট করা। যুক্তরাষ্ট্রই চলতি বছর হতে যাওয়া এ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক।

উভয়পক্ষ অনড় অবস্থানে: ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ ঘোষণার পর যৌথ বিবৃতিতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন ইইউ নেতারা। বিবৃতিতে বলা হয়, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবেন না। ট্রাম্পের এমন শুল্ক আরোপের হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

এদিকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নিজের অবস্থানে অনড় ট্রাম্প। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ডেনমার্ক কিছুই করতে পারেনি। গ্রিনল্যান্ড দখলের সময় এখনই। এ ক্ষেত্রে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেননি।

তবে ডেনমার্ক সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৫৭ হাজার জনসংখ্যাও যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে নারাজ। গত শনিবার ডেনমার্কের রাজপথে হাজার হাজার মানুষ ট্রাম্পের এ হুমকির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন। মাখোঁ স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হুমকিতে ইউরোপ তার অবস্থান থেকে সরবে না। স্টারমার ট্রাম্পের এই শুল্ক পরিকল্পনাকে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই একগুঁয়েমি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কই নয়, বরং সামরিক জোট ন্যাটোর অস্তিত্বকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপের জন্য ৭২ কোটি টাকায় মিডিয়া স্বত্ব কিনছে সরকার

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন চলছে

বুবলীর খবরের মাঝেই অপুর পোস্টে কিসের ইঙ্গিত!

দীর্ঘ দুই দশক পর নারী প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার লড়াই আজ

রামিসা হত্যা মামলার রায় পর্যবেক্ষণে যা বললেন আদালত

প্রতিবাদ সভায় বক্তারা / চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই

দক্ষিণ লেবাননের আরও কয়েকটি শহরে ইসরায়েলি হামলা

মৃত মাকে দেখতে যাওয়ার পথে প্রাণ গেল মেয়ের

খাদ্য প্যাকেটের সম্মুখভাগে সতর্কবার্তা বাড়াবে ভোক্তা সচেতনতা, কমাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি

১০

চরিত্র হনন: এক নীরব ঘাতক

১১

সব ডেথ রেফারেন্সই দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নেবেন: আইনমন্ত্রী

১২

ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তির হুমকিতে সতর্ক পেন্টাগন

১৩

উত্তাপহীন বিসিবি নির্বাচনে ৩৫ মিনিটে পড়েছে ১ ভোট

১৪

ছাত্রদল নেতাকে মারধরের অভিযোগ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কের বিরুদ্ধে

১৫

অঝোরে কাঁদছিলেন রামিসার বাবা, চোখ বন্ধ রেখেছিলেন স্বপ্না

১৬

ভিসা ছাড়াই যে ৩৬ দেশে যেতে পারবেন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা

১৭

রামিসা হত্যা মামলা / রায়ের সময় কাঠগড়ায় দোয়া পড়ছিলেন সোহেল

১৮

সরকারে আসার ঝুঁকি এতটা ভয়াবহ হবে ভাবিনি: ফারুকী

১৯

৫ কার্যদিবসে মামলার রায় একটি ‘মাইলফলক’: রাষ্ট্রপক্ষ

২০
X