

যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের ও যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে নতুন করে প্রকাশিত নথিপত্র বিশ্ব রাজনীতিতে ফের তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে—এ যৌন অপরাধীর সঙ্গে কখনো না মিশেও তার কারণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদ হারানোর মতো গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েছেন। অথচ এ কেলেঙ্কারিতে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম জড়িয়েছে, বিভিন্ন তদন্তে তার অর্থলগ্নি থেকে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তা সত্ত্বেও তিনি আছেন রাজনৈতিকভাবে একেবারে বহালতবিয়তে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সিএনএনের এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, এপস্টেইনের সঙ্গে কখনো সরাসরি যুক্ত না থাকলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের ঘনিষ্ঠ ও সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক সামনে আসায় ব্রিটিশ রাজনীতিতে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক নথিতে দাবি করা হয়েছে, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনকে গোপন ও বাজার সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য দিয়েছিলেন। এর জেরে ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে এবং তিনি লেবার পার্টি ও হাউস অব লর্ডস থেকে পদত্যাগ করেছেন।
চাপে পড়ে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ক্ষমতাবানরা যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় এপস্টেইনের ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। বুধবার তিনি পার্লামেন্টে বলেন, ‘ম্যান্ডেলসন আমাদের দেশ, পার্লামেন্ট ও দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’
এর এক দিন পর নিজ দলের এমপিদের বিদ্রোহ ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তার প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন অনিশ্চিত।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন চিত্র। নতুন এপস্টেইন নথিতে ট্রাম্পের নাম থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা করা হয়নি। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এপস্টেইন ইস্যুতে নতুন করে কোনো প্রসিকিউশন হবে না। ট্রাম্প বিষয়টিকে ‘দেশের এগিয়ে যাওয়ার সময়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের শক্ত অবস্থান, রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের ওপর তার প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক দুর্বল জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ার কারণেই তিনি এ কেলেঙ্কারি থেকে বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে পেরেছেন। অন্যদিকে ব্রিটেনে সংসদীয় জবাবদিহি, গণমাধ্যমের চাপ এবং দলীয় রাজনীতির ভেতরের দ্বন্দ্ব স্টারমারকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারির প্রভাব শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্রিটিশ রাজপরিবারেও এর প্রতিধ্বনি দেখা গেছে। রাজা চার্লস তৃতীয় তার ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে সব রাজকীয় উপাধি থেকে সরিয়ে দেন এবং রাজকীয় দায়িত্ব থেকে কার্যত নির্বাসিত করেন।
এর মধ্যে জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে কাটানো ‘প্রতিটি মুহূর্ত’ নিয়ে অনুতাপ প্রকাশ করেছেন বিল গেটস। তবে তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা বলেছেন, দণ্ডপ্রাপ্ত কুখ্যাত যৌন অপরাধী এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ও সময় কাটানো নিয়ে মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতার এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাকি আছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ৩০ লাখ পাতার নথি প্রকাশ করেছে। ওইসব নথিতে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব, অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং ইমেইলে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। নথিতে অনেক ব্যক্তিগত ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।
নথির মধ্যে থাকা একটি খসড়া ইমেইলে এপস্টেইন অভিযোগ করেছেন, বিল গেটস বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। এপস্টেইন লিখেছেন, গেটসের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে ছিল—বিল গেটসকে মাদক পেতে সহায়তা করা, রুশ মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পরের পরিণতি মোকাবিলায় সহায়তা করা এবং বিবাহিত নারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক সহজ করা।
এর মধ্যে গত বুধবার অস্ট্রেলিয়ার নাইন নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস বলেন, ‘আমি তার (এপস্টেইনের) সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তের জন্য অনুতপ্ত এবং ক্ষমা চাইছি।’ বিল গেটস আরও বলেন, ‘ওই ইমেইল কখনো পাঠানো হয়নি। ওই ইমেইলটি মিথ্যা। আমি জানি না, তিনি সেখানে কী ভাবছিলেন। তিনি কি কোনোভাবে আমাকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিলেন?’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এপস্টেইন কাণ্ড এখন আর শুধু একজন অপরাধীর গল্প নয়—এটি ক্ষমতা, প্রভাব এবং জবাবদিহির বৈশ্বিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। আর সেই সংকটে কে টিকে থাকবেন, আর কে হারাবেন ক্ষমতা—তা নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও নেতৃত্বের শক্তির ওপর।