

দরজার বাইরে প্রতিদিন পাওনাদারের কড়া নাড়া আর ভেতরে অনিশ্চিত জীবনের ভয়। এমন চাপে পিষ্ট হয়ে থেমে গেছে একটি পরিবারের চারটি প্রাণ। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এক দম্পতির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক। রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের পল্লবী ওয়াপদা বিহারি ক্যাম্প এলাকার একটি বাসা থেকে দুই শিশুসন্তানসহ এক দম্পতির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, ঋণের চাপ সইতে না পেরে শিশুদের হত্যার পর স্বামী-স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের (পল্লবী) বি-ব্লকের ওয়াপদা ৩ নম্বর ভবনের একটি টিনশেড বাসা থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন রিকশাচালক মোহাম্মদ মাসুম, তার স্ত্রী ফাতেমা আক্তার সুমি এবং তাদের দুই ছেলে সাড়ে ৩ বছর বয়সী মিনহাজ ও দেড় বছর বয়সী আসাদ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কোনো এক সময় তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাসার ভেতরে একসঙ্গে চারজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন) মহিদুল ইসলাম বলেন, মাসুমের গলায় দাগ রয়েছে এবং স্ত্রী ও দুই শিশুর শরীরেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমে স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করে পরে মাসুম আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্তের পরই প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনা তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট কাজ করেছে।
আর্থিক সংকটে মাসুম সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার ফুপাতো ভাই মান্না। তিনি বলেন, বেনারসি শাড়ির কারচুপি করার পাশাপাশি তার ভাই রিকশাও চালাতেন। ব্যক্তিগতভাবে মাসুমের কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না, তিনি ছিলেন ধার্মিক মানুষ। আমরা ধারণা করছি, অভাব সইতে না পেরে মাসুমের স্ত্রী তার দুই সন্তানকে খাবারে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন। পরে মাসুমের স্ত্রী খাবারের বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর আত্মহত্যা করেন মাসুম।
ýপুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের (পল্লবী) বি-ব্লকের ৩ নম্বর ওয়াপদা ভবন বিহারি ক্যাম্পে তাদের লাশ পাওয়া যায়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কোনো এক সময় তাদের মৃত্যু হয়। ýস্থানীয়রা বলছেন, নিহত পরিবারটি টিনশেড বাসা নিয়ে ভাড়া থাকত। স্বামী রিকশা চালাত এবং স্ত্রী বিভিন্ন বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এ পরিবার বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছিল। যার ফলে তারা ঋণগ্রস্ত ছিল। প্রতিদিন কেউ না কেউ ঋণের জন্য বাসায় আসত। হয়তো কোনো উপায় না পেয়ে পরিবারের শিশুদের নিয়ে স্বামী-স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।
পল্লবী থানার ওসি এ কে এম আলমগীর জাহান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে। তিনি বলেন, স্থানীয়দের বক্তব্য ও প্রাথমিক আলামত অনুযায়ী এটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি বলেই মনে হচ্ছে। ঋণের চাপের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।