

তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাট। একটি কক্ষে থাকতেন ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান, অন্যটিতে তার মেয়ে। বাকি কক্ষটি ব্যবহার করা হতো স্টোররুম হিসেবে। ফ্ল্যাটের মূল দরজা পেরিয়েই চোখে পড়ে আবর্জনার স্তূপ। শোবার ঘর থেকে রান্নাঘর—প্রায় পুরো বাসাজুড়েই ছড়িয়ে ছিল ময়লা-আবর্জনা। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও দুর্গন্ধে ভরে ছিল পুরো ফ্ল্যাট। সবচেয়ে বেশি আবর্জনা জমেছিল নূর জাহানের কক্ষে। সেখান থেকেই পরে তার পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ ঘটনায় তার সন্তানদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। ঘটনার জেরে নূর জাহান বেগমের ছেলে যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করেছে সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে পরিবারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন নূর জাহান বেগমের ছোট ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান। তিনি দাবি করেন, মায়ের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিবার সম্পর্কে নানা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পর আমরা এমনিতেই মানসিক ট্রমার মধ্যে আছি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে নানা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, এতে আমরা মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছি।’
তিনি বলেন, মা মারা যাওয়ার পর থেকে অনেকেই বলছেন, ছেলেমেয়েরা মাকে দেখভাল করেননি। বিষয়টি সত্য নয়।
আশিকুর রহমান জানান, ২০০৯ সালে মাকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে আসেন। ২০১১-২০১২ সালে তিনি দেশের বাইরে ছিলেন, তখন তার শাশুড়ির বাসায় মাকে রেখেছিলেন। ২০১৩ সালে আবার নিজের কাছে আনেন। মা মাঝেমধ্যে চাঁদপুরের মতলবে নানাবাড়িতে গিয়েও থাকতেন। ২০২০ সালে করোনার সময় মায়ের করোনার চিকিৎসা করান।
নূর জাহান বেগম যেভাবে নোংরা পরিবেশে মারা গেলেন, তা অস্বাভাবিক কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আশিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি কিছুটা অস্বাভাবিক, তা নিয়ে সমালোচনাও হতে পারে। তবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এর আগে ৩১ মে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে নূর জাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটি তদন্ত করছেন পল্লবী থানার এসআই শামছুর রহমান। তিনি বলেন, নূর জাহানের স্বামী মজিবুর রহমান অনেক আগেই মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পর ছেলেরা মায়ের খোঁজখবর না রাখায় মেয়ে কাছে থাকতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নূর জাহান বেগম শয্যাশায়ী। সবশেষ মাকে তার মেয়ে নড়াচড়া করতে দেখেছেন ঈদের আগের দিন, ২৭ মে। এরপর সাড়াশব্দ না থাকায় ৩১ মে নার্স ডেকে আনলে মৃত্যুর বিষয়টি জানা যায়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, মায়ের প্রতি চরম অবহেলা, অযত্নের চিত্র ছিল এটি। কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের প্রতি এমনটি যেন না করেন।’
সূত্র : প্রথম আলো