কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অনাবাদি ভূমিতে আলোর হাতছানি

অনাবাদি ভূমিতে আলোর হাতছানি

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার একটি গ্রাম নাম নিমুরিয়া। জীবিকা ও জীবনমানে পিছিয়ে থাকা এ গ্রাম এখন উঠে এসেছে উন্নয়নের সড়কে। আর এর অন্যতম কারিগর জুলস পাওয়ার লিমিটেড (জেপিএল)। নিমুরিয়ার পতিত জমি কাজে লাগিয়ে সেখানে মুক্তাগাছা সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড (এমএসইএল) নামে ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি স্থানীয় কৃষকদের উপার্জনের সুযোগও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নির্মাণাধীন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটির মাধ্যমে জীবিকা ও জীবনমান উন্নত করার এবং বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে অবদান রাখার সম্ভাবনা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির সমাধানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের মধ্যে জেপিএল অন্যতম। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহযোগিতায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছে জেপিএল।

মুক্তাগাছা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানায়, মুক্তাগাছা উপজেলায় শীত মৌসুমে ৩০ মেগাওয়াট এবং গরমের মৌসুমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এমএসইএলের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে লোডশেডিং কমে আসবে, উপকৃত হবে মুক্তাগাছাবাসী।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, উপজেলার নিমুরিয়া গ্রামের ৭৪ একর জমির ওপর ২০২৫ সালের মে মাসে ২০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির কাজ শুরু হয়। এলাকাটি জলাবদ্ধ এবং দুর্গম হওয়ায় এসব জমি কৃষি বা অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হতো না। জুলস পাওয়ার লিমিটেডের সহযোগিতায় প্রকল্পটি ২২ বছরের জন্য বার্ষিক লিজ নিয়ে নির্মিত হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জমি ভরাট না করে পিলারের ওপর স্ট্রাকচার করে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার এবং ভাসমান ফ্লোটারের ওপর কেবল বসিয়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই সৌরবিদ্যুৎ চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বছরে ৩৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং ২৪ হাজার ৩৪৪ টন কার্বন নিঃসরণ এড়াবে।

জেপিএল কর্মকর্তা মো. মেহেদুল ইসলাম বলেন, এই অনুর্বর, পতিত ও অনাবাদি জমির মালিকরা এতদিন এ জমি থেকে কোনো উপকার পেতেন না; এমনকি জমির বার্ষিক ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার মতো অর্থও উপার্জন হতো না। এখন প্রতি বছর ভাড়ার টাকা পাবেন। এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ২০০ জনের অধিক স্থানীয় কর্মী এ প্রকল্পে কাজ করছেন। উৎপাদন শুরু হলে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রকল্পের কারণে এলাকার জনবসতি এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি উৎপাদনশীল শিল্প কলকারখানা স্থাপন বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন। এতে করে এলাকায় চুরি-ছিনতাই কমে যাবে। দিনের বেশিরভাগ সময় তারা লোডশেডিংয়ে পড়েন। এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে বিদ্যুৎ সমস্যা থাকবে না বলে আমরা আশা করছি।

আব্দুল মালেক নামে একজন জমির মালিক বলেন, জলাশয় ও কচুরিপানার মধ্যে আমার জমি, তাই সেটি পড়ে থাকত। সেজন্য আগে আমি জমি কোনো কাজে লাগাতে পারতাম না। এই পরিত্যক্ত জমি থেকে কোনো আর্থিক সুবিধাও পেতাম না। এখন জমি লিজ দিয়েছি; প্রতি বছর ভাড়া পাব। এতে আমার আয়ের একটা ব্যবস্থা হলো।

রঘুনাথপুরের ৫০ বছর বয়সী কৃষক মাহাবুবুল আলম কাজল বলেন, আমার ২২০ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি ছিল। উৎপাদনশীল করার জন্য বারবার চেষ্টা চালিয়েছি; কিন্তু কাজ হয়নি। আগাছা, কচুরিপানা এবং মশায় ভরা ছিল। তিনি বলেন, জমিটি কয়েক দশক ধরেই অব্যবহৃত ছিল, এখান থেকে কোনো আয় আসেনি। সৌর প্রকল্পের জন্য লিজ দেওয়ার ফলে আমি আমার পরিবারের বার্ষিক খরচ মেটাতে পারব।

আরেক কৃষক আব্দুল হান্নানেরও একই অভিজ্ঞতা ছিল পানির নিচে থাকা জমি নিয়ে। অনুৎপাদনশীল জমি থেকে এখন বাড়তি আয়ের সুযোগ হয়েছে। এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কেবল স্থানীয় পরিবারের জন্য নয়, জাতীয় গ্রিডের জন্যও একটি স্থিতিশীল, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ময়মনসিংহে ২০ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য মুক্তাগাছা সোলাটেক এনার্জি লিমিটেডের (এমএসইএল) সঙ্গে ২ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের চুক্তি সই করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৯১ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার ৫৫৩ টাকা।

এডিবি জানায়, মুক্তাগাছা সোলারটেকের জন্য অর্থায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সিন্ডিকেট করেছে সংস্থাটি। এটি বাংলাদেশ ভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানি জুলস পাওয়ার লিমিটেডের মালিকানাধীন। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, এ ঋণের মধ্যে এডিবি থেকে দেওয়া হবে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার এবং এডিবি পরিচালিত লিডিং এশিয়ান প্রাইভেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড-২ (এলইএপি-২) থেকে দেওয়া হবে ৮৮ লাখ ডলার।

এ প্রকল্পের অধীনে ২০ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের সমর্থনপ্রাপ্ত দেশের প্রথম বেসরকারি খাতের ইউটিলিটি-স্কেল সৌর স্থাপনার একটি।

এডিবি বেসরকারি সেক্টর অপারেশনের পরিচালক সুজান গ্যাবরী বলেন, এডিবির অর্থায়নের লক্ষ্য বাংলাদেশের অগ্রগতি ও টেকসই জ্বালানি সমাধানকে এগিয়ে নেওয়া। দীর্ঘমেয়াদি এই অর্থায়ন নবায়নযোগ্য প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ মূলধন চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করবে।

তিনি আরও বলেন, এডিবি জেপিএলকে সহযোগিতা করতে পেরে আনন্দিত। এটি টেকসই সমাধানের অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে অগ্রণী দক্ষতা ও উদ্ভাবনে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ১২ টাকায় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বর্তমানে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২ হাজার ২১৫ মেগাওয়াটের মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসে। এর মধ্যে সৌরশক্তি ৮০ শতাংশ। সরকার দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশে বৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য বেসরকারি খাতের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানের হাতে এখনও ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে : ট্রাম্প

হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম কমলো বিশ্ববাজারে 

দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বড় সুখবর

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩

‘পাড়ার গুন্ডা-মাস্তানের মতো কথা আপনার মুখে মানায় না’, ঢাবি ট্রেজারারকে সর্ব মিত্র চাকমা

তিন সপ্তাহ যেতেই নতুন উপাচার্য পেল জাবিপ্রবি

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় আদ্-দ্বীনের দুই কর্মীকে অব্যাহতি

ঋতুপর্ণার গোলে সমতা, স্বপ্ন বাড়ল বাংলাদেশের

কখন, কীভাবে দেখবেন আর্জেন্টিনা-হন্ডুরাসের ম্যাচ

রামিসা হত্যা মামলার রায় রোববার

১০

সাইবার ঝুঁকি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় বিপদ : তথ্যমন্ত্রী

১১

১৯৭৮ বিশ্বকাপ : আর্জেন্টিনার গৌরব, নাকি বিশ্বকাপের কলঙ্ক?

১২

‘মিড-ইয়ার শপিং ফেস্টে’ আকর্ষণীয় অফার দিচ্ছে দারাজ

১৩

জীবনের অর্থ নিয়ে রহস্যময় পোস্টে ফের আলোচনায় ঐশ্বরিয়া

১৪

ইয়াবাসহ ছাত্রলীগ নেতা আটক

১৫

গোপন বৈঠক করতে গিয়ে গ্রেপ্তার ছাত্রলীগ নেতা

১৬

বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক জোরদারে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

১৭

নারায়ণগঞ্জে আ.লীগের ৫ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার

১৮

দিনাজপুরের এক হাসপাতালে ৫ মাসে বেশিরভাগই নরমাল ডেলিভারি

১৯

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ট্রেজারার ড. বোরহান উদ্দিন

২০
X