

বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মানচিত্রে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। এবারের নির্বাচনে জেলার ৪টি আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা নজরকাড়া লড়াই করেছেন।
ভোটের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াত বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার আশাতীত ফল অর্জন করেছে। চারটি আসনের সবকটিতেই জামায়াতের বাক্সে পড়া ভোটের সংখ্যা চমকে দিয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা পেয়েছেন মোট ভোটের ৪০ শতাংশ। এর আগে ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে এ চারটি আসনে জামায়াত পেয়েছিল প্রায় ১৬ শতাংশ ভোট। এ হিসেবে ৩০ বছরের ব্যবধানে জামায়াতের ভোট বেড়েছে ২৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ৩টি আসন ও ১৯৯১ সালের ৪টি আসনের ফল এবং ২০২৬ সালে জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ৪৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ৪৫ দশমিক ০৭ শতাংশ ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান স্বাক্ষরিত ফলপত্র বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে লক্ষ্মীপুরের ৪টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে ১৯৯৬ সালে জেলার ৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জামায়াতের প্রার্থীরা। ১৯৯৬ সালে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ১৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোট পান। সে সময়ে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। এর আগে ১৯৯১ সালে আসনটিতে জামায়াত প্রার্থী ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোট পান। ১৯৯৬ সালে ৩টি আসনে ভোট এবং ১৯৯১ সালে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি) আসনে ভোটের হিসাবে জামায়াত প্রার্থীরা ৪টি আসনে ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। ২০২৬ সালে এসে তা নাটকীয়ভাবে বেড়ে হয়েছে ৪০ শতাংশ। এ হিসেবে গত ৩০ বছরে জামায়াতের ভোট বেড়েছে ২৪ শতাংশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী শাপলা প্রতীকে মাহাবুবুল আলম, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে জামায়াতের দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় জেলা আমির মাস্টার রুহুল আমিন ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম দাঁড়িপাল্লায় এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এ আর হাফিজ উল্যা দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ৫৯ হাজার ২৬৫ ভোট, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৮, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ১ লাখ ২২ হাজার ৮০২ এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে ভোট পেয়েছেন ৭৩ হাজাট ৭৫৬টি। সব আসনে জামায়াত জোট ভোট পেয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫২১।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে শাহাদাত হোসেন সেলিম। তার প্রাপ্ত ভোট ৮৬ হাজার ৮১১। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের এনসিপির মাহবুব আলম পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৬৫ ভোট। এ আসনে ২ লাখ ৮১ হাজার ৩০২ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৬২ জন। প্রদত্ত ভোটের হার ৫৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর-সদর একাংশ) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির আবুল খায়ের ভূঁইয়া। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩২১। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৯৮ ভোট। এখানে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ২৬ ভোটারের মধ্যে ভোট দেন ২ লাখ ৯৭ হাজার ২৭০ জন। প্রদত্ত ভোটের হার ৬০ দশমিক ১৭ শতাংশ।
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ড. রেজাউল করিম পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৮০২ ভোট। এখানে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৩ ভোটারের মধ্যে ২ লাখ ৭২ হাজার ৪৩০ ভোটার ভোট প্রদান করেন। প্রদত্ত ভোটের হার ৬১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের এ আর হাফিজ উল্লাহ পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৭৫৬ ভোট। এ আসনে ৪ লাখ ১৮ হাজার ১৫৮ ভোটারের মধ্যে ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৬৭ ভোটার ভোট দেন। প্রদত্ত ভোটের হার ৫৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বিএনপির ভোটের মানচিত্র: ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪টি নির্বাচনকে ভিত্তি ধরে লক্ষ্মীপুরে বিএনপির ভোটের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি পায় ৩৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট, ১৯৯৬ সালে ধানের শীষ পায় ৩৭ দশমিক ১০ শতাংশ ভোট।
২০০১ সালে ধানের শীষ প্রতীক পায় ৪১ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট। আর ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থীরা পান ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট। এ চারটি নির্বাচনে বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের গড় ছিল ৩৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অবশ্য এসব নির্বাচনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যে ভোট পান, তা শতকরা হিসাবে ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভোট শতকরা হিসাবে গড়ে কমেছে। অন্যদিকে জামায়াতের ভোট বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত ১৭ বছর গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি জামায়াত নারীদের ইসলামী বয়ানের আসর তালিমে উদ্বুদ্ধ করেছে। তালিম থেকেই ৬০ ভাগ নারী দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। এ ছাড়া নতুন ভোটারদের অধিকাংশ ভোটই জামায়াত জোট পেয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা জামায়াতের সহ-সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মহসিন কবির মুরাদ বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী আদর্শের রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তা ছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঁদা বাণিজ্য, দখল রাজত্বসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ততার কারণে তুলনা করে ভালো দল হিসেবে জামায়াতকে বেছে নিয়েছেন ভোটাররা। বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটাররা জামায়াতের পক্ষে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে জামায়াতের প্রার্থীরা খুব ভালো ফল অর্জন করেছেন।’
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট হাছিবুর রহমান বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে অতীতের হিসেবের তুলনায় বিএনপির ভোটও বেড়েছে। তবে ভোটের সময় জামায়াত গ্রামের সরল ভোটারদের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে দাঁড়িপাল্লায় উদ্বুদ্ধ করেছে। বিশেষ করে গ্রামের নারীরা সরলমনের হয়ে থাকে। এর সুযোগ নিয়ে তাদের পরকালের ভীতি দেখিয়ে জামায়াতের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।’