

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় একটি বাসায় সিলিন্ডারের গ্যাস জমে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছে। এতে নারী ও শিশুসহ ৯জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। অন্য আটজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আটজনকে ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
সোমবার ভোরে হালিশহরের এইচ ব্লকে এসি মসজিদসংলগ্ন একটি ভবনে এ বিস্ফোরণ হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সিলিন্ডার লিক হয়ে রান্নাঘরে গ্যাস জমেছিল। পরে আগুনের সংস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটে। মারা গেছেন ৪০ বছর বয়সী নুরজাহান আক্তার রানী। তার শরীরের শতভাগ দগ্ধ হয়েছিল। বাকি দগ্ধরা হলেন—আয়েশা (৪), আনাছ (৭), আইমান (১০), শাওন (১৭), সাখাওয়াত (৪৬), শিপন (৩২), সুমন (৪০) ও পাখি (৩৫)।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ভোর সাড়ে ৪টায় ‘হালিমা মঞ্জিল’ নামের ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে তাদের পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা দগ্ধদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানোর সময় পথে নুরজাহান রানী মারা যান বলে জানান বলে জানান তার আত্মীয় জামশেদ আলম।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ওই বাসায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির লাইনের গ্যাস সংযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়ে রান্নাঘরে জমেছিল। পরে আগুনের সংস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটে।
চমেকের বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, দগ্ধদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালির শতভাগ পুড়ে গেছে। মো. শিপনের শ্বাসনালির ৮০ শতাংশ পুড়েছে। মো. সুমন ও মো. শাওনের শরীরের ৪৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তিন শিশু মো. আনাস, উম্মে আইমন ও আয়েশা আক্তারের শরীরের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ দগ্ধ হলে সেটিকে আশঙ্কাজনক ধরা হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসক ডা. আশফাক জানান, প্রত্যেকের শ্বাসনালিতে ধোঁয়া প্রবেশ করেছে এবং ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তাদের অবস্থা আরও জটিল করেছে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের এখানে বিস্ফোরণে দগ্ধ অবস্থায় ৯ জনকে আনা হয়। সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।’
বিস্ফোরণে ভবনের তৃতীয় তলার চারটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে গেছে। যে ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেখানে আসবাবপত্র থেকে দেয়াল পর্যন্ত পুড়ে গেছে। রান্নাঘরের সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রান্নার সামগ্রী। একটি কক্ষে একটি আইপিএস ব্যাটারি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পাশের ফ্ল্যাটের আসবাবও লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।
ভবনটির বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অন্যান্য দিনের মতো সেহরি খেতে উঠেছিলাম। হঠাৎ পাশের ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের শব্দ পাই। বের হয়ে দেখি আগুনে দগ্ধ চার-পাঁচজন ছোটাছুটি করছেন। গায়ের কাপড় ঝলসে গেছে। একজনের কাপড়ে তখনো আগুন জ্বলছিল। আমি দৌড়ে গিয়ে একটি শিশুকে বের করে আনি। তার গায়ে পানি ঢালি। আরও দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি। চারদিকে এখন ভাঙা জিনিসপত্র, ভয়াবহ অবস্থা।’
দগ্ধদের স্বজন মো. মকবুল হোসেন বলেন, বাসাটিতে মূলত দুই ভাইয়ের পরিবার থাকত। সম্প্রতি বিদেশ থেকে তাদের আরেক ভাই দেশে এসে পরিবার নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তিন পরিবারের সদস্যরাই দগ্ধ হয়েছেন।
রাজধানীর হাজারীবাগে এক পরিবারের চারজন দগ্ধ: রাজধানীর হাজারীবাগের রায়েরবাজার এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে আগুনে একই পরিবারের নারী ও শিশুসহ চারজন দগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধরা হলেন— শেখ রোমান (৩৫), তার স্ত্রী পিংকি আক্তার (৩২), তাদের তিন বছর বয়সী ছেলে মায়ান (৩) এবং রোমানের শ্যালক অপু (২৩)। সোমবার ভোরে রায়েরবাজারের ১৪৭ নম্বর জাহানারা ভিলা ভবনের নিচতলায় এ ঘটনা ঘটে। পরে তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে।
শেখ রোমানের বাড়ি নেত্রকোনার খালিয়াজুরী থানায়। তিনি বর্তমানে পরিবার নিয়ে মোহাম্মদপুরের পূর্ব রায়েরবাজারে জাহানারা ভিলার নিচতলার ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
দগ্ধদের হাসপাতালে নেওয়া মো. মামুন জানান, বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। এতে পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভর্তি করেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, রায়েরবাজার এলাকা থেকে দগ্ধ অবস্থায় চারজনকে জরুরি বিভাগে আনা হয়। শেখ রোমানের শরীরের ২৫ শতাংশ, পিংকি আক্তারের ৭৫ শতাংশ, শিশু মায়ানের ২৪ শতাংশ এবং অপুর ৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। দগ্ধদের মধ্যে দুজনকে হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে রাখা হয়েছে। তাদের সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক।