

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) এখনো কার্যকর না হলেও বেড়েছে দেশটি থেকে তুলা আমদানির পরিমাণ। তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ শতাংশ তুলার আমদানি বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তৈরি পোশাকে উন্নতমানের সুতার মিশ্রণ ব্যবহারের জন্যই মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলার আমদানি বাড়ছে। যেখানে বৈশ্বিক বাজার থেকে তুলার আমদানি ১৬ শতাংশ কমেছে।
তবে বাণিজ্য চুক্তি অনুসারে তুলা আমদানির নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ নাও হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের তুলার মান কিছুটা ভালো হওয়ায় দামও অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। তার ওপর চুক্তিতে যে যে সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তার কোনো সুরাহা হয়নি এখনো। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলার প্রতি এই আগ্রহ নাও থাকতে পারে ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বর্তমানে দেশের চাহিদার ৭ থেকে ৮ শতাংশ তুলা আমদানি হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় প্রতি পাউন্ড তুলার দাম ৩-৪ সেন্ট বেশি। এ ছাড়া আমদানি খরচও ২-৩ সেন্ট বেশি। সব মিলিয়ে প্রতি পাউন্ড তুলায় ৫-৭ সেন্ট বেশি খরচ হয় যুক্তরাষ্ট্রের তুলায়। এই বাড়তি খরচ দিয়ে তুলা আমদানি করে পোশাকের বাড়তি দাম পাওয়া অনিশ্চিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাড়তি দাম দেবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র্রের তুলা ব্যবহার খুব একটা বাড়বে না বলেই মনে করছেন তারা।
এই বাড়তি সুবিধার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে তৈরি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, তুলার মূল্য কামানো অন্যতম।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তুলা উৎপাদনকারী দেশ হলো চীন, বিশ্বের ২৯ শতাংশ তুলা উৎপাদন করে দেশটি। এর পর রয়েছে ভারত, ২০ শতাংশ তুলা উৎপাদন করে দেশটি। ব্রাজিল করে বিশ্ব চাহিদার ১৬ শতাংশ এবং চার নম্বর অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র করে ১১ শতাংশ। এ ছাড়া পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়া ৪ শতাংশ করে তুলা উৎপাদন করে থাকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, ভারত, ব্রাজিল, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কাঁচা তুলা আমদানি হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ মোট ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কাঁচা তুলা আমদানি করেছে। যার মোট মূল্য ছিল ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় কিছুটা কম।
দেশে আমদানি করা এই তুলার ২৩ শতাংশই আসে ব্রাজিল থেকে। দ্বীতিয় অবস্থানে ছিল ভারত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে মার্চ—এই ৯ মাসে বিশ্ববাজার থেকে বাংলাদেশ মোট ২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের কাঁচা তুলা আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ কম। আগের বছর আমদানি হয়েছিল ২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার।
তবে এর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬ সালের গত তিন মাসে (জানুয়ারি- মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে মোট ৫২ হাজার ৮২ মেট্রিক টন বাল্ক তুলা রপ্তানি করেছে। যার মোট মূল্য ৮৭ মিলিয়ন ডলার। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। গত বছরের একই সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বাল্ক তুলা রপ্তানি করেছিল ৩২ হাজার ৬০ মেট্রিক টন। যাার মোট মূল্য ছিল ৫৬ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসের তুলনায়ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানি ৩০ হাজার টন বেড়েছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাস্ট্র ১ লাখ ৩৫ হাজার টন তুলা বাংলাদেশে রপ্তানি করেছিল। চলতি বছর এই রপ্তানি ২ লাখ টন ছাড়াতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলার দাম কিছুটা কমে এসেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের তুলার গড় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ১ ডলার ৭৪ সেন্ট, যা চলতি বছর এখন পর্যন্ত গড় দাম ১ ডলার ৬৬ সেন্টে নেমেছে। তার আগে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম ছিল আরও বেশি—১ ডলার ৯২ সেন্ট। দাম কমলেও এখনও তুলনামূলক বেশি। ফলে অন্যান্য বাড়তি সুবিধা না পাওয়া গেলে আমদানির এই আগ্রহ হারিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, দেশের তৈরি নিট পোশাক পণ্যের ৫০ শতাংশ কাঁচামাল হলো তুলার তৈরি সুতা। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম সব মিলিয়ে ৫ থেকে ৭ সেন্ট বেশি। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছু তুলা আমরা আমদানি করি। তবে সেগুলো ক্রেতাদের চাহিদার কারণে। কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাকে ১০ শতাংশ উন্নতমানের সুতা ব্যবহারের শর্ত দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা থেকে সেই সুতা তৈরি করা যায়। তবে দাম কমালে এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা পেলে আমদানিও বাড়বে।
তিনি বলেন, বলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক থাকবে না। যেহেতু পাল্টা শুল্ক বাতিল হয়ে গেছে, তাই মোট শুল্ক থেকে ১৯ শতাংশ ছাড় দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয়। এই চুক্তি করা হয় ট্রম্প প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্ক কামানোর জন্য। ওই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) আইনের অধীনে। এই আইন সাধারণত ব্যবহৃত হয় জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায়। তবে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। আদালত বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই শুল্ক আরোপে আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। বাণিজ্য ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা দেখিয়ে শুল্ক বসানো যায় না।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া চুক্তি অনুয়ায়ী, বাংলাদেশ তার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য ক্রয় বা বাংলাদেশি কোম্পানির মাধ্যমে ক্রয় সহজতর করার চেষ্টা করবে, যার মধ্যে গম (পাঁচ বছরের জন্য প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ টন), সয়াবিন এবং সয়াজাত পণ্য (এক বছরে অন্তত ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ টন, যেটি কম), এবং তুলা অন্তর্ভুক্ত, যার মোট আনুমানিক মূল্য হবে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
গত ২০২৫ সালজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৩৫ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি হয়। তার আগের বছর তুলা আমদানি হয়েছে ২৪৪ মিলিয়ন ডলারের। ২০২৩ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪০ মিলিয়ন ডলারের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তির শর্ত মানলে কমপক্ষে দেড় বিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করতে হবে বাংলাদেশকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম কালবেলাকে বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকেই যেখানে তুলা আমদানি করা যাচ্ছে, অথবা আফ্রিকা থেকে কম দামে তুলা আমদানি হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি খুব বেশি বাড়বে না বলেই মনে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ যদি উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানির দিকে যায় তবে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের তুলার ব্যবহার অনেক বাড়াতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪-এর আওতায় আবার ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক ধার্য করেন সবদেশের জন্য। এই আইনে জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে আমদানি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক বসানো যায়। তবে এরও মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫০ দিন। এরপর কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে।
এই ১০ শতাংশের বাইরে আগে থেকেই সাড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য। সে হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য আমদানিকারককে মোট সাড়ে ২৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।
তবে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও মানবসৃষ্ট তন্তু দিয়ে তৈরি কিছু পোশাকে পাল্টা শুল্ক থাকবে না। সে হিসাবে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে সুবিধা পাবে মাত্র ১০ শতাংশ।
তাছাড়া ১৫০ দিন পর এই ১০ শতাংশ শুল্ক বাতিল হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে কোনো সুবিধা পাওযা যাবে কি না, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু আলোচনা হয়নি।
চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি হওয়া ‘নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাক পণ্যের’ ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসবে না, তবে তা ‘পরে নির্ধারিত একটি পরিমাণ’ পর্যন্ত। সুতরাং শেষ পর্যন্ত পোশাক পণ্য কতটা সুবিধা পাবে, তা নির্ভর করবে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একক সিদ্ধান্তের ওপর। অর্থাৎ ছাড় পেলেও এসব পোশাক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে না।
এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে শুল্ক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে কারিগরি সমস্যাও রয়েছে। এই তুলা ব্যবহারের হিসাব কীভাবে হবে এই প্রশ্নের সমাধানও হয়নি। তুলা আমদানির ওপর হবে, না সুতার হিসাব রাখা হবে—এসব কোনো কিছুরই সুরাহা হয়নি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পণ্য শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা বা আমদানিকারকরাই কিনবেন। বৈশ্বিক বাজারের বাকি দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি করতে হবে কম দামের তুলা দিয়ে তৈরি সুতা থেকে, যা আফ্রিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে একজন কারখানা মালিককে দুই নীতিতে চলতে হবে।
এসব নানা জটিলতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানিতে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না আমদানিকারকরা। এতে কিছুটা কমেছে আমদানিও।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান কালবেলাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা আগেও ছিল। কিন্তু কেউ এই সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেনি। কারণ এতে অনেক জটিলতা রয়েছে। তাছাড়া এত বাড়তি দামের তুলা ব্যবহার করে এই পোশাকের বাড়তি দাম তো ক্রেতারা দেবে না। এতে লোকসানে পড়বেন রপ্তানিকারকরা। এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলার আমদানি কিছুটা বাড়লেও এই উৎসাহ না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।