

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়সীমা ৩০ থেকে ৪৫ দিন। কিন্তু লেগে যাচ্ছে তিন থেকে সাত মাস। সময়সীমা না মানায় বাড়ছে সেশনজট। বিলম্বিত হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া। একদিকে মাস্টার্সের ক্লাস শেষ না হওয়া এবং অন্যদিকে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ায় দেখা দিচ্ছে ক্লাসরুম সংকট। এ জন্য শিক্ষার্থীদের এমনকি গাছতলায় বসে ক্লাস করতে হচ্ছে।
বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী সূত্রে জানা যায়, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর শেষ হলেও ফল প্রকাশ হয় ৫ মাস পর চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি। একইভাবে কলা অনুষদের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা গত বছরের ২৪ আগস্ট শেষ হলেও ফল প্রকাশ হয় ৭ মাস পর ২০২৬ সালের ৮ মার্চ।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা ২০২৫ সালের ২১ জুলাই শেষ হলেও ফল প্রকাশ হয় ৪ মাস পর ১২ নভেম্বর। ফাইন্যান্স বিভাগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের অনার্সের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের ১ মাস আগেই শুরু হয়েছিল মাস্টার্সের পরীক্ষা। তবে, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া পরীক্ষার মাত্র ৪৯ দিনে ফল প্রকাশ করে।
এভাবে দুই-একটি বাদে প্রায় সবই পরীক্ষার ফল বিলম্বে প্রকাশ করায় সেশনজটের প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ভর্তি সম্পন্ন হলেও ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের কোনো বিভাগ এখনো পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি মাস্টার্স। এ ছাড়া স্পোর্টস সায়েন্স, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, ইইইসহ একাধিক বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের কেউই এখনো চূড়ান্ত মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, আবার কারও প্রকাশ হয়নি ফল। ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও এখনো শেষ করতে পারেননি তাদের মাস্টার্স পরীক্ষা।
এর ফলে তৈরি হয়েছে শ্রেণিকক্ষ সংকট। অনেক বিভাগে ক্লাস নিতে হচ্ছে সেমিনার কক্ষ কিংবা গাছতলায়। চলতি বছরের ১৭ মে দুপুরে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম সংকটের কারণে গাছতলায় ক্লাস করতে দেখা যায়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের দাবি, একাডেমিক অর্ডিন্যান্সে নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ বাস্তবে সম্ভব নয়।
তাদের মতে, বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন, একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা, একজন শিক্ষকের একাধিক কোর্সে পাঠদান ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত দায়িত্বসহ বিভিন্ন কারণে ফল প্রকাশে বিলম্ব ঘটে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এনায়েত উল্ল্যা পাটওয়ারী বলেন, ‘এটি আগ থেকেই চলে আসা একটি সংস্কৃতি, তবে আমরা এটি কমানোর চেষ্টা করছি। এখন আমরা প্রতিটি বিভাগের পরীক্ষার বিষয়ে রিপোর্ট নেব।’
৪৫ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের অর্ডিন্যান্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অর্ডিন্যান্সে রয়েছে তবে বাস্তবতা হলো— দেড় মাসের মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। এটি যখন প্রণয়ন করা হয়েছিল, তখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম ছিল।’ এদিকে চাকসু নির্বাচনের আগে দ্রুত সময়ের মধ্যে রেজাল্ট প্রকাশের ব্যাপারে ইশতেহার দিয়েছিলেন আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক ফজলে রাব্বি তাওহিদ।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের আগের সভাগুলোয়ও আলোচনা হয়েছে এবং পরবর্তী সভাতেও এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরই মধ্যে আমরা বিভিন্ন শ্রেণি প্রতিনিধির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছি। যেসব বিভাগে ফল প্রকাশে তুলনামূলক বেশি বিলম্ব হয়, সেগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে সমস্যার কারণ চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য কাজ করছি। নতুন যে কারিকুলাম সেটি কার্যকর হলে এটি অনেকটাই কমে যাবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্যোগসহ নানা কারণে সেশনজট আমাদের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। তবে, নতুন যে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হয়েছে, সেটি একটি সুসংগঠিত কাঠামো। এখানে কতটি ক্লাস হবে, কখন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে সবকিছুই নির্ধারিত রয়েছে। এর জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছি, পাশাপাশি ক্লাস প্রতিনিধিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। এ প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি কার্যকর হলে সেশনজট অনেকটাই দূর হবে।’