

একটি শোষণ-বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম; কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও গণতন্ত্রের প্রধান উপাদান অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কি অধরাই থেকে যাবে?
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে। কিন্তু অভ্যুত্থানের শরিক দলগুলো নানা ইস্যুসহ জুলাই সনদ ও পিআর পদ্ধতির নির্বাচন নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। তাই জনমনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এ পরিস্থিতিতে কি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? সরকার নির্বাচনের জন্য কি সমতল ভূমি তৈরি করতে পারবে? এমনকি আগামী ফেব্রুয়ারিতে কি নির্বাচন হবে?
জনগণ এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা চায়, যাতে প্রতিটি নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়; জনগণ যাতে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি স্বাধীনভাবে নির্বাচন করার সুযোগ পায় এবং তারা যাদের ভোট দেবেন, তাদেরই যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে পান। তাতে বহিঃশক্তিও নাক গলানোর সুযোগ পাবে না।
বহুদলীয় গণতন্ত্রে জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোকে বুঝতে হবে, দেশের জনগণ দেশে শান্তি চায়। সব অংশীজনের সহযোগিতায়ই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। বিশ্বায়নের যুগে নির্বাচনে পরিকল্পিত সহিংসতা সৃষ্টি করে জনগণের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের সুযোগ নিলে বিশ্ব প্রশ্ন তুলবেই।
যে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যতটুকু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে যতটুকু সুশাসন আছে, সেই দেশে ততটুকুই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায়। পাশাপাশি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মূলত এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতার কারণেই আমাদের দেশের নির্বাচনে বিদেশিরা নাক গলানোর সুযোগ পায়। কারণ, জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র একটি আন্তর্জাতিক দলিল, যা জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রের মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা সংহত করে। এ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানার বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের আছে। কেননা বাংলাদেশ এই ঘোষণাপত্রে ১৯৩টি স্বাক্ষরকারী দেশের একটি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ধারা-২১-এর ১ ও ৩ উপধারায় বলা আছে:
১. প্রত্যক্ষভাবে বা অবাধে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ দেশের শাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে।
৩. জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারের শাসন ক্ষমতার ভিত্তি; এই ইচ্ছা নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্ত হবে; গোপন ব্যালট কিংবা সমপর্যায়ের কোনো অবাধ ভোটদান পদ্ধতিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সুতরাং স্বাক্ষরকারী কোনো দেশের পক্ষে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ধারা-২১-এর ১ ও ৩ উপধারা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেউ বা কোনো দেশ যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন না করে বা না করতে পারে, তাহলে যে কেউ বা যে কোনো দেশই সেই দেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে। এটাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলা যাবে কি? তাই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন আর এখন অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; ‘গণতান্ত্রিক বিশ্বের’ বিষয়।
এম এ আজিজ
সাংবাদিক ও কলামিস্ট