

আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির। তিনি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। পরে ১৯৮২ সালে কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার, ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রদূত কবির বর্তমানে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন
বাংলাদেশের ২০২৪-এর মতোই নেপালে তরুণদের বিক্ষোভে দেশটির সরকার পতন হলো। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। আমাদের গণঅভ্যুত্থান ও তাদের অভ্যুত্থানের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য পার্থক্য লক্ষ করছেন কি?
এম. হুমায়ুন কবির: প্রথমেই বলে রাখি, আমি ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নেপালে বাংলাদেশের দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেছি। তখন নেপালে মাওবাদী আন্দোলন চলছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাওবাদী আন্দোলন চলেছে। ১৭ হাজার লোক তখন মারা গেছে। মূল যে বক্তব্যটার ভিত্তিতে এ আন্দোলন হয়েছিল, তা হলো তারা ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীন এবং একটা গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চায়। ২০০৫ সালে এসে এ আন্দোলনটা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটা সমঝোতার মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরত আসে। তারই ধারাবাহিকতায় পরের বছরগুলোতে নেপালি কংগ্রেস, মাওইস্ট পার্টি এবং ইউএমএল ক্ষমতায় এসেছিল। এই তিন দলই ২০০৮ সালের পর থেকে ক্ষমতায় থেকেছে। আমার ধারণা যে, মাওবাদী আন্দোলনের সময় নেপালব্যাপী তরুণ প্রজন্মের চিন্তার যে বিকাশ ঘটেছিল এবং তারা ন্যায়বিচার সাম্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের যে স্বপ্নটা দেখেছিল, মাওবাদী আন্দোলন থেমে গেলেও সেই স্বপ্ন বা আন্দোলনের শক্তি থেকে গেছে। ২০০৮ সাল থেকে যেসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতা চালিয়েছে, তাদের মধ্যে মাওবাদী নেতা প্রচন্ড, ইউএমএল নেতা অলি, কংগ্রেস নেতা দেউবা ছিল, অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠী একই রয়ে গেছে। মাওবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল, সেখানে নতুন রাজনীতি আসেনি। প্রচন্ড মাওবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনিও প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর অংশ হয়ে গেলেন। গত বছরই কংগ্রেস ও ইউএমএলের মধ্যে সমঝোতার ফল হিসেবে অলি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
নেপালে দুই ধরনের সমাজ বিদ্যমান। একটা হচ্ছে পার্বত্য সমাজ, আরেকটা হচ্ছে সমতলের সমাজ। সমতলের সমাজ নেপালে অপেক্ষাকৃত দুর্বল। ২০০ বছরেরও বেশি সময় বা নেপাল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই পার্বত্য সমাজই নেপালকে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের প্রায় ১১৫টা জাতিগত গোষ্ঠী আছে। সবারই সমান সুযোগের যে ব্যবস্থা—সেই ব্যবস্থার কিছু কিছু অগ্রগতি রাজনৈতিকভাবে হয়েছে ২০০৮ সালে ফেডারেল স্ট্রাকচার তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ক্ষমতার যে পুনর্বিন্যাস হওয়া দরকার ছিল; নিম্নবর্গের মানুষ বা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা ছিল, সেভাবে কিন্তু হয়নি। এই না হওয়ায় ক্ষমতার অংশ হতে না পারা, বৈষম্যের শিকার হওয়া, ন্যায়বিচার না পাওয়া—এ তিনটি বিষয় কেন্দ্র করেই নেপালের তরুণ প্রজন্ম এবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। তারা যাদের উৎখাত করেছে, তারা অনেকেই মাওবাদী আন্দোলনের সময়কার হিরো। ২০০৬-০৭ সালে তারাই ছিলেন হিরো, তারাই মাওবাদী আন্দোলন চালিয়েছে। নেপালকে গণতান্ত্রিক পর্যায়ে উত্তরণে তারাই হিরো হিসেবে ছিলেন। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম দেখছে যে, এই গোষ্ঠী তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে না। বরং তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না, তারা তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতাদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা দেখেও কর্মসংস্থানহীন, সুবিধাবঞ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তরুণ প্রজন্ম বিক্ষুব্ধ হয়েছে। প্রযুক্তি আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সেই বিক্ষোভ রাতারাতি স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়েও গেছে। তারা তাদের বিক্ষুব্ধ মানসিকতার সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগে নিজেদের ভেতরেই একটা শক্তির আবির্ভাব দেখতে পেয়েছে। যার মাধ্যমে তরুণরা ভেবেছে, তারা এখন নিজের শক্তিতেই ক্ষমতার অংশ হতে পারে এবং সেখানে রাজনৈতিক দলের কোনো প্রয়োজন নেই। সেই উদ্যোগেরই একটা চেহারা আমরা দেখলাম। তারা সব রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই বিক্ষোভ করেছে। প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই তারা গেছে এবং সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করেছে। এখানে দুটি বিষয় নেপালের জন্য উল্লেখযোগ্য এবং আমাদের জন্যও শিক্ষণীয়। একটি হচ্ছে, তাকেই নিয়ে এসেছেন তারা, যার পরীক্ষিত সততা রয়েছে, অর্থাৎ তিনি এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি একজন সত্যিকার অর্থেই নিরপেক্ষ মানুষ, আইনের শাসনের মানুষ এবং ব্যক্তিগতভাবে সৎ মানুষ। সে কারণেই বিক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম তাকে পছন্দ করেছে এবং তাকে নেপালের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় যে জায়গা, সেটি আমাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ—তা হলো, যখনই নেপালে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন দেখা দিয়েছিল যে, কে হবেন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান, তখন তরুণ প্রজন্ম একটা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটাভুটি করেছে। সেই ভোটেই তারা নিশ্চিত করেছে যে, কার ওপর আস্থাটা বেশি আছে। সেখানেই জাস্টিস সুশীলা কার্কি তাদের প্রধান পছন্দের মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কাজেই এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে প্রক্রিয়া নেপালের তরুণরা প্রদর্শন করল, এটা রাজনীতির নতুন উপাদান বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, তারা পরীক্ষিত লোককেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন আগে, পাস করেছেন, তেমন একজন ব্যক্তিকেই তারা দায়িত্বটা দিয়েছে। নেপালে আমরা রাজনীতির নতুন বিন্যাস লক্ষ করলাম এবং আমার মনে হয় শুধু নেপাল নয়, এর প্রভাব নেপালের বাইরেও ভবিষ্যতে দেখতে পাব।
নেপালের তরুণরা আন্দোলন-পরবর্তী রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াটি তৈরি করে দিয়ে চলে গেছে, রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেনি। দ্বিতীয় হলো, বিক্ষোভে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তার জন্য তারা ক্ষমাও চেয়েছে। এ বিষয়গুলো কীভাবে দেখছেন?
এম. হুমায়ুন কবির: এটা নেপালের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা অন্য কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশে পাবেন না। তা হলো, নেপালের মানুষদের মধ্যে শিষ্টাচারের বোধটা অনেক বেশি। ক্ষমা চাওয়াকে তারা অতটা খারাপ বিষয় মনে করে না। আমি অপরাধ করেছি, আমি ক্ষমা চাইব—এটা তাদের পুরোনো সংস্কৃতির অংশ। এর মধ্যে কিছু ধর্মীয় উপাদান আছে, কিছু সামাজিক উপাদান আছে, কিছু রাজনৈতিক উপাদানও আছে। এটাকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখি। তারা ক্ষমতায় যায়নি—সেটা আবার আরেকটা হিসাবনিকাশ। কারণ তারা মনে করেছে যে, তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করেছে। এখন আর তাদের শক্তি প্রদর্শনের দরকার আছে বলে মনে করছে না। সে কারণে তারা ক্ষমতায় যায়নি। যারা ক্ষমতা সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন, তাদের হাতেই তারা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে। কাজেই আমি আশ্চর্য হচ্ছি না। আমাদের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন, তাদের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। নেপালের প্রেক্ষাপটে এটাই আমার কাছে প্রত্যাশিত মনে হয়েছে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত হওয়ার একটা অত্যাবশ্যকীয় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সোশ্যাল মিডিয়া। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এর ফল সম্পর্কে আপনার অনুধাবন কী?
এম. হুমায়ুন কবির: আরব বসন্তের কথা বলা হয়। এখন এশীয় বসন্তের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা মিশ্র। কিছু দেশে এটা সফল হয়েছে, যেমন তিউনিশিয়ায়। কিছু দেশে এটা সফল হয়নি। শুধু সফল হয়নি তা নয়, সিরিয়ায় বহুদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। মিশরে সামরিক শাসন আবার ফেরত এসেছে। যে নাগরিক অধিকারের জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে, সেগুলো অনেক দূরে সরে গেছে। আরব বসন্ত শুধু ওই অঞ্চলের ছিল না, তার মধ্যে সক্রিয়ভাবে ভূরাজনীতিও কাজ করেছে। আপনি যদি সিরিয়া ও মিশরের দিকে দৃষ্টি দেন, তাহলে দেখবেন, সেখানে বিশ্বের ভূরাজনীতিতে সক্রিয় সব শক্তিই এখানে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে। সেটা আপনি রাশিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলেন, তুরস্ক বলেন, ইসরায়েল বলেন—সবাই সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণনটা সেভাবে দেখছি না এখনো। যদিও নেপালের এ পরিবর্তনে ভারত খুশি হয়েছে। খুশি হওয়ার কারণ হচ্ছে যে, অলি সরকার ২০১৬ সাল থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছে। ভারতের বাইরেও চীনের মধ্য দিয়ে তারা ট্রানজিট সুবিধা নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে, উত্তর আফ্রিকায় যেভাবে আরব বসন্তের সময় তীব্রভাবে আমরা ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা দেখেছি—দক্ষিণ এশিয়ায় চীন এবং ভারতের মধ্যে কিন্তু এই মুহূর্তে সেই সম্ভাবনা আমি দেখছি না এবং সেটা একটা ইতিবাচক জায়গা। নেপাল যদি অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে, তাহলে সেই সক্ষমতার ভিত্তিতে তার একটা ট্রানজিশনের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে যদি অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাদ করতে থাকে, তাহলে ভিন্ন ব্যাপার। যদি অভ্যন্তরীণভাবে মোটামুটি একটা সহমতের জায়গায় থাকতে পারে, তাহলে তুলনামূলকভাবে তারা তাদের এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমার তাই মনে হয়। ভারতের সঙ্গে আমরা সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে আছি। কিন্তু এখানে চীন-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা খুব বেশি প্রভাবিত করছে বলে অন্তত এখনো আমরা দেখছি না। সে ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা দিয়ে আমাদের এ ব্যবস্থাটা উত্তরণের দিকে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে ভালো ফল মিলবে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে আপনি ভূরাজনীতির কোনো আলামত দেখছেন কি?
এম. হুমায়ুন কবির: ভূরাজনীতি নেই সেটা আমি বলছি না। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যাটা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকেই উৎসারিত। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই জনগণের সরকার বলতে যেটা বুঝি—অর্থাৎ শুধু ভোট দেওয়া নয়, শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নয়, নাগরিক অধিকার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার বা মানবাধিকারের যে বিস্তৃত প্রেক্ষাপট আছে, সে জায়গায় কোনো রাষ্ট্রই সেভাবে আধুনিক রাষ্ট্র নয়। পাকিস্তানের কথা বলেন, সেটারও একই অবস্থা। এসব দেশ রাষ্ট্র হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আছে, কিন্তু তার মানুষের জন্য সে কতটা কার্যকর, কতটা দরদি, সে প্রশ্ন করাই যায়। ভারতে এখনো কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের যে অবস্থা, তা অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশে আমরা বলছি গণতন্ত্রের কথা, কিন্তু শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া গণতন্ত্রের চর্চা বা মূল্যবোধ কি আমাদের আছে? কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের কি সম্মান আছে? কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মক্ষম থাকুক এটা কি আমরা চাই? এবং সাধারণ মানুষের অধিকার কি সে অর্থে কার্যকর হয়েছে বলে মনে করতে পারি? একই কথা নেপালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো রাষ্ট্রই নাগরিকদের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি এখনো। আর নাগরিকদের রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে, ততক্ষণ যতই কাঠামো তৈরি করুন না কেন, নাগরিকরা যদি কখনো নারাজ বা বিক্ষুব্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেটাকে টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। বিশেষ করে এখন কয়েকটা নতুন উপাদান আমরা দেখছি। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এখানে তরুণ প্রজন্ম জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ সংখ্যায় তারা বেশি। দ্বিতীয় হলো, সব দেশেই কর্মসংস্থানের ঘাটতি। সব দেশেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সেটি কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে তরুণ প্রজন্ম বিক্ষুব্ধ হচ্ছে, হতাশ হচ্ছে। আর নিওলিবারেল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের ফলে বৈষম্য বাড়ছে। কাজেই যারা তরুণ না, তারা প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো যে, আগে সরকারের কাছ থেকে মানুষ তথ্য-উপাত্ত পেত বা পেতে চাইত। কন্ট্রোল অব ইনফরমেশন একটা ক্ষমতা হিসেবে ছিল। এখন আর সেই ক্ষমতা সরকারের নেই। প্রত্যেকটা নাগরিকই এখন তথ্যপ্রযুক্তিতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। ফলে নাগরিকদের নিজেদের মধ্যেই এখন এক ধরনের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল ক্ষমতা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা। দুপক্ষের মধ্যে দূতিয়ালি করার দায়িত্বটা ছিল তাদের। এখন তরুণ প্রজন্ম তাদের এ দূতিয়ালির দায়িত্বটা গ্রহণ করছে না। তারা নিজেরাই নিজেদের এজেন্সি নিয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ তরুণ প্রজন্ম নিজেরাই সে দায়িত্ব পালন করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে তা বাংলাদেশে আমরা দেখলাম। তরুণ প্রজন্ম সেই দায়িত্বটা পালন করল। রাজনৈতিক দলগুলো পেছনে পেছনে হেঁটে এটা প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করেছে যে, তারা তাদের সঙ্গে আছে। নেপালে তরুণ প্রজন্ম সব রাজনৈতিক দলকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে তারা একটা নতুন সরকার গঠন করল। শ্রীলঙ্কায়ও আমরা তাই দেখলাম। কাজেই অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আমরা আগে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, যে রাজনৈতিক মূল্যবোধ, যে রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছি—আগামী দিনে সে রাজনৈতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখাটা খুব চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ, তরুণ প্রজন্ম নিজেরাই ক্ষমতার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। আমার ধারণা, প্রযুক্তির কারণে আগামী দিনে সেটা আরও বেশি ত্বরান্বিত হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েন তৈরি হলো, যা এখনো বিদ্যমান। এর কারণ কী?
এম. হুমায়ুন কবির: আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের স্বার্থটা কী? এর প্রধানতম উপাদান হচ্ছে, বাইরের মানুষ আমাদের কীভাবে চেনে? আমাদের ভাবমূর্তি বা ইমেজটা কী? বাংলাদেশকে বিশ্বের মানুষ গণতান্ত্রিক, উদার এবং পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত একটা দেশ হিসেবে দেখতে চায়। এটাই আমাদের ভাবমূর্তি। কাজেই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন আমাদের কোনো অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এ ভাবমূর্তির কাঠামোটা ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিন্তু বাংলাদেশের মৌলিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি তিনটা স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কৃষি, আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। কৃষিতে বাইরের পৃথিবীর একটা বড় অংশগ্রহণ আছে। আমদানি-রপ্তানিতে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—এ চার শক্তি আমার অত্যাবশ্যকীয়। আর রেমিট্যান্স প্রবাহও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই এ মৌলিক বিষয়গুলো যদি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে আমরা বিপদে পড়ে যাব। অর্থনীতির এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে। কাজেই যে সরকারই বাংলাদেশে থাকুক, এ বিষয়টা মাথায় রেখেই তাকে এগোতে হবে।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আমরা বাইরে থেকে বিনিয়োগ চাচ্ছি, দেশীয় বিনিয়োগ চাচ্ছি, যে সরকারই আসুক তাকে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে আইনের শাসন থাকতে হবে। সেখানে কোনো ধরনের উগ্র চিন্তা যদি ঢুকে পড়ে, তাহলে আপনি দেশীয় বিনিয়োগও পাবেন না, বাইরের বিনিয়োগকারীরাও আসবে না, কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না। কাজেই মধ্যপন্থা থেকে আপনি যে কোনো দিকেই যান না কেন, তাতে বিপদের আশঙ্কা বাড়বে। আর ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের অবনতির বিষয়ে বলব যে, এটা অবশ্যই বিপজ্জনক, তবে আমরা যেন তাদের নতুন করে কোনো সুযোগ তৈরি করে না দিই। গত পনেরো বছরে তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে যে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে—সেটা এখন পাবে কি না, সেই নিশ্চয়তা তাদের নেই। এর কারণে হয়তো তারা এক ধরনের হতাশায় ভুগছে। আরেকটি বিষয় হলো, ভারতকে শক্তি হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়ার জন্য যে আঞ্চলিক সহযোগিতা দেখানোর দরকার ছিল, সেটা তারা বাংলাদেশ থেকে পেয়েছে। সার্ক এখানে অকার্যকর হয়ে গেছে—ভারত যেদিন ঘোষণা করেছে আমরা যাব না, তার পরদিনই বাংলাদেশও ঘোষণা করেছে যে, আমিও যাব না। তাতে কী দাঁড়াল? সার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নষ্ট হয়ে গেল, ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আমি বলব যে, আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র, কাজেই আমি যদি সম্মানজনক ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখি, তাহলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা খুব কঠিন কাজ নয়। সে ক্ষেত্রে ভারতই যেহেতু ৫ আগস্টের পর নিজে উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে, ফলে তাকেই সে জায়গায় এগিয়ে আসতে হবে। আমার ধারণা, বাংলাদেশের দিক থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কথাবার্তায় যা বুঝি তা হলো, ভারত এগিয়ে এলে এ সরকার সাড়া দেবে। তা ছাড়া ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ রেখে আমাদের কোনো লাভ নেই। আমরা ভারতের সঙ্গে যেসব পারস্পরিক ক্ষেত্র আছে, সেগুলোকে সম্মানজনক জায়গায় রাখতে চাই, সমতার ভিত্তিতে রাখতে চাই। যে কথাটা আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন। আমাদের মতভিন্নতাও থাকবে, সহমতও থাকবে—এটাকে মাথায় রেখেই আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
বিগত দিনগুলোতে আমরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা দেখেছি। এখন আমরা নতুন করে চিন্তা করছি যে, একটা পরিবর্তন আসবে। আপনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?
এম. হুমায়ুন কবির: আমি আশাবাদী হতে চাই। আশাবাদী হতে চাই দুই-তিনটা কারণে। তরুণ প্রজন্ম যখন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা যখন একটা দিকে যাত্রা করেছে—আমি জানি এখানে ঘাটতি আছে; কিন্তু আমি যদি প্রজন্ম হিসেবে দেখি, তাহলে আমি তো তরুণ প্রজন্মের উত্থান দেখতে পাচ্ছি। যে প্রজন্ম নতুন চিন্তা নিয়ে এসেছে। নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এসেছে। এটা আমার কাছে আশার সঞ্চার করে। দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ৫৪ বছর ধরে যা দেখছি—মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের শক্তির জায়গাটা এ দেশের সাধারণ মানুষ। এ দেশের সাধারণ মানুষ যতদিন সচেতন আছে, ততদিন পর্যন্ত আপনি হয়তো সাময়িকভাবে সুবিধা নিতে পারবেন, কিন্তু চূড়ান্ত বিবেচনায় আপনাকে দায়বদ্ধতায় আসতেই হবে। এ দেশের সাধারণ মানুষরা কিন্তু পরিশ্রম করে সৎভাবে তাদের জীবন নির্বাহ করতে আগ্রহী। একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তারা যেতে চায়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে তার সম্মান করে। তারা আশা করে, যারা ক্ষমতায় থাকবেন তারাও যাতে গণতান্ত্রিকভাবে তাদের সঙ্গে সে আচরণটাই করেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা সেটা দেখি না। আবার নেপালের কথায় যদি আসি, সেখান থেকেও দেখা যায় যে, একসময় যারা হিরো ছিলেন, তারাও কিন্তু আজকে ভালো জায়গায় নেই। এটা শুধু নেপালের রাজনীতিবিদদের জন্য শিক্ষার বিষয় নয়, সবার জন্যই এ শিক্ষা। রাজনীতিবিদরা যদি জনগণের প্রত্যাশা ও তাদের স্বপ্নকে ধারণ না করেন—তাহলে জনগণও তাদের প্রতি কোনো দায়বোধ অনুভব করবে না। এখানেই একটা নতুন চিন্তার সুযোগ আছে। আমি বলব যে, একানব্বই থেকে চব্বিশ সাল পর্যন্ত আমরা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি গণতন্ত্রের জন্য, সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভালো-খারাপ দিকগুলোর একটা বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। তা যদি না হয়, তাহলে আজকে যারা হিরো হিসেবে আছেন, আগামী ১০-১৫ বছর পর তারা কোথায় থাকবেন তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। কারণ, তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি অগ্রসর, অনেক বেশি চিন্তাশীল। তারা এ দায়বদ্ধতা দাবি করে। কাজেই তাদের এ চিন্তাটাকে মাথায় রেখে আগামী দিনের রাজনীতির বিবর্তনটা যদি সংগঠিত হয়, তাহলেই আমরা আশাবাদী হতে পারি।
আগামী বছর নির্বাচন হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
এম. হুমায়ুন কবির: আমরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি যে, তারা কী ভাবে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক সংস্কার চায়। দুটো জায়গায় তারা নির্দিষ্টভাবে বলেছেও। একটা হচ্ছে, তারা চায় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বদল। নিয়মিত বিরতিতে তারা দলের নেতৃত্বের বদল চায়। দ্বিতীয় হচ্ছে, দলগুলো টাকা-পয়সা কোথা থেকে পায়, কোথায় খরচ করে, তার একটা সুনির্দিষ্ট হিসাব তারা দেখতে চায়। কাজেই জনগণ বলেই দিয়েছে তারা কী চায়। রাজনীতিবিদরা যদি শুধু জনগণের কণ্ঠটাই শুধু শোনে, তারা বুঝে যাবে যে তাদের কী করতে হবে, সেটা আমাদের বলে দিতে হবে না।
নারী আসন নিয়ে যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, আমরা মাঠপর্যায়ে দেখেছি যে, সেখানে ৯১ ভাগ মানুষই বলেছে নারীদের সরাসরি নির্বাচন তারা সমর্থন করে। আর কিছু বলার আছে? এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিন, মানুষ তো তাদের কথাটা বলে দিয়েছে। মানুষ এগিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ যদি একটা সুষম অর্থনীতির দেশ হয়, বাংলাদেশ যদি একটা সম্মানজনক জায়গায় থাকতে পারে, দেশের ভেতরে যেমন আমরা ভালো থাকব। বাইরের পৃথিবীতেও একটা সম্মানজনক জাতি হিসেবে আমরা মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারব। এটাই তো আমাদের প্রত্যাশা। এটা সবারই প্রত্যাশা।