শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ড. মো. ছিদ্দিকুর রহমান খান
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন

শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন

প্রত্যেক জাতির ইতিহাসে কিছু মানুষ জন্ম নেয়, যারা শুধু সময়ের সাক্ষী থাকেন না, বরং সময়কে নিজের করে নেন। তারা হয়ে ওঠেন অতীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পথচলার অবিচল দিকনির্দেশক। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই মহান ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। তিনি শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। স্বাধীন-উত্তর বাংলাদেশে জাতির এক ক্রান্তিকালে সামরিক ব্যারাক ছেড়ে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরতে হয়। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন একজন সমরনেতা থেকে মহান রাষ্ট্রনায়কে। রাষ্ট্রপতি জিয়াকে বলা হয় আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবর্তক। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থান নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি যে অনন্য ভূমিকা পালন করেন; অতীতের আলোয় তা যেমন উজ্জ্বল, তেমনি বর্তমান এমনকি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতির পথনির্দেশনায়ও তা প্রাসঙ্গিক।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার ঘোষক, জেড ফোর্সের প্রধান এবং একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে জিয়াউর রহমানের বীরত্বের ইতিহাস সুবিদিত। কিন্তু তার প্রকৃত মহিমা উদ্ভাসিত হয় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির এক চরম ক্রান্তিকালে। যখন একটি নবজাতক রাষ্ট্র হিংস্রতা, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই অন্ধকারময় মুহূর্তে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির আশার প্রতীক।

একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। এটি ছিল জিয়াউর রহমানের সচেতন রাষ্ট্রদর্শন ও সাহসী সিদ্ধান্তের ফল। শেখ মুজিব কর্তৃক প্রবর্তিত একদলীয় শাসনের রুদ্ধ পরিবেশে যখন মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক বহুত্ব কার্যত নিষ্প্রাণ, তখন তিনি সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে রাজনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করেন। রাষ্ট্রক্ষমতার একমুখী প্রবাহ ভেঙে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনেন জনতার প্রাঙ্গণে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ভিন্নমত, প্রতিযোগিতা ও বিকল্প চিন্তার সহাবস্থান ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন। জিয়ার দর্শনে গণতন্ত্র শুধু একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং জনগণের অধিকার, অংশগ্রহণ ও দায়বদ্ধতার সম্মিলিত রূপ। তাই তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা পুনঃপ্রবর্তন, সংবিধানিক কাঠামোতে বহুদলীয় ব্যবস্থার স্বীকৃতি, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের সুযোগ অবারিত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠনের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তার এ উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তর নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিন অবদমিত জনগণের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে পুনঃস্থাপন করার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভেঙে জনগণকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার জিয়ার এ প্রয়াস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন দিগন্তের সূচনা করে, যা আজও বহুদলীয় ব্যবস্থার মৌলিক প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।

শহীদ জিয়া ছিলেন একজন বাস্তববাদী অর্থনীতিবিদ। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও আত্মনির্ভরতার পথে তার কৃতিত্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জিয়া বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ তখনই আসবে যখন জনগণ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। তার ‘গ্রাম হবে শহর’ স্লোগান গ্রামীণ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত, খাদ্যসংকট ও উৎপাদনহীনতায় জর্জরিত অর্থনীতিকে সচল করতে তিনি রাষ্ট্রনির্ভরতার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে উৎপাদনমুখী ও বাস্তবভিত্তিক নীতির দিকে অগ্রসর হন। কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, গ্রামীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কৃষকের প্রণোদনার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেন। তার সময়েই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে এগিয়ে যায়। তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে গুরুত্ব দেন, যাতে গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং শহরমুখী চাপ কমে। শিল্প খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন ছিল জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। ‘উৎপাদন বাড়াও, জনসংখ্যা কমাও’ এ বাস্তববাদী আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি উন্নয়নকে কাগুজে পরিকল্পনার গণ্ডি থেকে বের করে শ্রম, উদ্যোগ ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেন। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থবিরতা কাটিয়ে সম্ভাবনার পথে যাত্রা শুরু করে, যা পরবর্তীকালে উন্নয়নধারার জন্য এক দৃঢ় ভিত্তি রচনা করে। তার সময়েই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয়, যা আজ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ‘কর্মই উপাসনা’—এ সূত্রটিও তিনি জাতির মননে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া জিয়ার ‘গ্রামই শক্তি’ ভাবনা আজকের টেকসই উন্নয়ন ধারণার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাযুজ্যপূর্ণ।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অবস্থানকে নির্ভরশীলতার গণ্ডি থেকে বের করে সক্রিয়, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন কূটনীতির ধারায় প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এ নীতিকে বাস্তব রূপ দিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করেন। মুসলিমবিশ্ব, উন্নয়নশীল দেশগুলো ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক জোরদার করে তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করেন। জাতিসংঘ, ওআইসি ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দায়িত্বশীল ও শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জিয়ার কূটনৈতিক প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে। শ্রমশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসী কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত করে তিনি পররাষ্ট্রনীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত করেন। এভাবেই জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা ও উন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়।

আজকের বাংলাদেশ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গণতন্ত্রের সংকট, রাজনৈতিক মেরূকরণ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব—সব মিলিয়ে জাতি আবারও দিশাহীনতার আশঙ্কায়। এ প্রেক্ষাপটে শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন ও চিন্তা ছিল বাস্তববাদ, জাতীয় আত্মমর্যাদা এবং জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়নের এক সুসংহত সমন্বয়, যা আজকের বাংলাদেশেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল সার্বভৌমত্বের দৃঢ়তা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সহাবস্থান। তিনি রাষ্ট্রকে শুধু প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখতেন; যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। আজকের বাংলাদেশে যখন গণতান্ত্রিক ভারসাম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, যুব কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ নতুন মাত্রা পেয়েছে, তখন জিয়ার আত্মনির্ভরতা, সহনশীলতা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিচিন্তা নতুন করে তাৎপর্য লাভ করে। উন্নয়নকে শিকড় থেকে শক্ত করা, রাজনীতিতে বহুত্ব ও মতভিন্নতার স্বীকৃতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান—এ সবকিছুই রাষ্ট্রপতি জিয়ার রাষ্ট্রদর্শনের মূল সুর, যা আজও বাংলাদেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণে কার্যকর পথনির্দেশনা দিতে সক্ষম।

শহীদ জিয়া ছিলেন সময়ের সন্তান, কিন্তু তার চিন্তা সময়ের ঊর্ধ্বে। অতীতের আলোয় তার অবদান যেমন আমাদের পথ দেখায়, তেমনি বর্তমান এমনকি ভবিষ্যতের দিশা হিসেবেও তার দর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের অভিযাত্রায় যদি আমরা সত্যিই টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথ খুঁজতে চাই, তবে শহীদ জিয়ার জীবন ও কর্ম থেকে প্রেরণা নেওয়া অপরিহার্য।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন ও জীবনাদর্শ বাস্তবায়নের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার দীপ্ত অঙ্গীকারই হবে জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর অন্যতম উপায়।

লেখক: অধ্যাপক ডিন, কলা অনুষদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মারধরের প্রতিবাদ করায় বন্ধুকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ

সাতক্ষীরায় সীমানা পিলারসহ আটক ৪

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে ফের আগুন

উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে সরকার

বিএনপি আবারও আওয়ামী লীগের ফাঁদে পড়েছে : নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী

পুলিশের উপস্থিতিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল

রাত ১টার মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে

আল্লাহর রহমতে বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছি: নৌ প্রতিমন্ত্রী

কৌশলগত অংশীদারত্ব-বাণিজ্য সম্প্রসারণে সম্মত বাংলাদেশ-তুরস্ক

দুধে মজাদার স্বাদ: ঘরোয়া ও ঐতিহ্যবাহী কিছু জনপ্রিয় খাবার

১০

বিশ্বকাপের আগে বর্ষসেরার পুরস্কার জিতলেন ইয়ামাল

১১

নির্বাচনের পরও ভারত দ্বিচারী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে: সাইফুল হক

১২

জেলেনস্কির বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন পুতিন

১৩

সান মারিনো ম্যাচের একাদশে নেই শমিত

১৪

ইউএনওর অভিযানে হামলার ঘটনায় ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

১৫

অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে : জয়সওয়াল

১৬

ভারতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার ক্লার্ক

১৭

আর্জেন্টিনা শিবিরে বড় সুখবর, দলে যোগ দিলেন মেসি

১৮

দুই হাজারের বেশি বন্দিকে ক্ষমা করলেন মোজতবা খামেনি

১৯

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘গোপন অস্ত্র’ হতে পারেন থিয়াগো

২০
X