

ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দুই ঈদ কেন্দ্র করে এখনো টিকে আছে। সারা বছর সিনেমা মুক্তির ধারাবাহিকতা থাকলেও, ঈদ ছাড়া প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানার মতো সিনেমা থাকে না। তবুও দুই ঈদেই প্রেক্ষাগৃহ মালিক থেকে শুরু করে পরিচালক-প্রযোজক সবাই সারা বছর হিসাবটা কষে নেন। কিন্তু এখানেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাইরেসি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা মুক্তি কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি ভেসে ওঠে টেলিগ্রাম লিংকে, ফেসবুক গ্রুপে বা পাইরেটেড ওয়েবসাইটে। কোনো ধরনের লজ্জা ও ভয় ছাড়াই এভাবে দিনের পর দিন চুরি হয়ে যাচ্ছে দেশের সিনেমা। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি শিল্পকর্ম মুহূর্তেই পরিণত হচ্ছে ফ্রি কনটেন্টে। দেখার যেন কেউ নেই! অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি শুধুই অপরাধ, নাকি সুসংগঠিত লুট?
সম্প্রতি বড় বাজেটের একাধিক সিনেমা পাইরেসির কবলে পড়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা আইনি ব্যবস্থাও নিয়েছেন। তবুও থেমে নেই অপরাধীদের এ কার্যক্রম। দুদিন আগেই ইউটিউবে মুক্তি পায় মন্দিরা চক্রবর্তী ও আরিফিন শুভ অভিনীত সিনেমা ‘নীলচক্র’। তবে পরিবর্তন করা হয়েছে সিনেমার নাম ও ভাষা। নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘চক্রব্যূহ’। এটি পরিচালনা করেছেন মিঠু খান। নির্মাতা জানান, তিনি এ ব্যাপারে জানেনই না। কে বা কারা ইউটিউবে পাইরেটেড কপি আপলোড করল এ প্রশ্ন তারও। তাহলে কি কপিরাইট বিক্রির কারণে নতুন করে মুক্তি পেয়েছে এ সিনেমা? প্রশ্নটি উঠতেই পরিচালক বলেন, ‘আমরা কপিরাইটে ইউটিউব চ্যানেলের কাছে সিনেমাটি বিক্রি করিনি। আমাদের না জানিয়ে কে বা কারা এটি ইউটিউবে ছেড়েছে, আমরা দ্রুত সেটা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেব।’ পরিচালক মিঠু খান আরও বলেন, ‘সিনেমার ডিজিটাল সংস্করণ অন্য কারও কাছে থাকার কথা নয়। আমি সিনেমার কাজ কলকাতায় করিয়েছি এবং সেখানে একটি কপি রয়েছে। আমার ধারণা, সেখান থেকেই কাজের সঙ্গে যুক্ত কেউ সিনেমাটি ইউটিউবে প্রকাশ করেছে।’
এ ধরনের পাইরেটেড সংস্করণের কারণে নির্মাতা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, বিশেষত যখন সিনেমাটি কিছুদিন আগেই দেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আই স্ক্রিনে মুক্তি পেয়েছে। এর আগেও শাকিব খান অভিনীত ‘তাণ্ডব’ ও ‘বরবাদ’, আফরান নিশো অভিনীত ‘সুড়ঙ্গ’, জাহিদ হাসান অভিনীত ‘উৎসব’ সিনেমাগুলোও পাইরেসির কবলে পড়েছিল। নিয়মিতই দর্শকপ্রিয়, বড় বাজেট ও তারকানির্ভর সিনেমাগুলোকেই টার্গেট করছে পাইরেসির সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্রের সদস্যরা।
সিনেমাসংশ্লিষ্টদের মতে, সিনেমা লিক হচ্ছে ভেতর থেকেই। পোস্ট-প্রোডাকশন ইউনিট, ডিস্ট্রিবিউশন চেইন, এমনকি হলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও সন্দেহের তালিকায়। মুক্তির প্রথম দিনেই যখন ‘এইচডি প্রিন্ট’ ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রশ্নটা আর এড়ানো যায় না, এ প্রিন্ট বাইরে গেল কীভাবে? নির্মাতাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে সিনেমা লিক করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ আজ পর্যন্ত এ চক্রের কোনো দৃশ্যমান শাস্তি হয়নি।
অন্যদিকে, কপিরাইট আইন থাকা সত্ত্বেও পাইরেসির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো নজির নেই। দু-একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দায় সারার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। কিন্তু পাইরেসি বন্ধ হয় না, বরং নতুন নামে, নতুন লিংকে আরও শক্ত হয়ে ফিরে আসে। এ পাইরেসির কারণে সিনেমায় বিনিয়োগ কমছে, বড় বাজেটের প্রজেক্ট পড়ছে ঝুঁকিতে। প্রযোজকরা যেমন নিরাপত্তাহীনতায় আগ্রহ হারাচ্ছেন, তেমনি নতুন নির্মাতারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। শিল্পী ও কলাকুশলীরাও ভুগছেন অনিশ্চয়তায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই যদি ডিজিটাল নজরদারি, কঠোর শাস্তি, ভেতরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শিগগিরই দেশের সিনেমা শুধু উৎসবের পোস্টারে আর স্মৃতিচারণায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। পাইরেসি শুধু সিনেমা মারে না, ভবিষ্যৎকেও হত্যা করে। আর সেই হত্যাকাণ্ড ঘটছে দিনের আলোয়। সবাই তা দেখছে, কিন্তু কেউ থামাচ্ছে না।