

কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার পূর্ব আলী আকবর ডেইল এলাকার বাসিন্দা রেখা রানী দাশের জীবনে যেন একের পর এক দুর্যোগ লেগেই আছে। স্বামী কাঞ্চন দাস পেশায় জেলে। প্রতিদিন মাত্র ৮০০ টাকার বিনিময়ে অন্যের ট্রলারে শ্রম দিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। ছয় মাস আগে জীবিকার সন্ধানে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। স্রোতের টানে ট্রলার ভেসে চলে যায় বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় জলসীমায়। সেখান থেকে ভারতীয় কোস্টগার্ড কাঞ্চন দাশসহ কয়েকজন জেলেকে আটক করে। সেই থেকে তিনি ভারতীয় কারাগারে বন্দি। এরপর থেকেই দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় রেখা রানীর বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
তিন বছরের মেয়েটিকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছিল। কিন্তু কয়েক মাস আগে আরেকটি বিপদ নেমে আসে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় তার মাত্র ৯ মাস ১৮ দিনের শিশুপুত্র। শিশুটিকে প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। পুনরায় হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির অবস্থা গুরুতর। তাকে আইসিইউতে রাখতে হবে এবং দ্রুত চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু তখন সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক বাস্তবতা। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বন্দি বিদেশের কারাগারে। ঘরে কোনো সঞ্চয় নেই। চিকিৎসার জন্য যা ছিল, কক্সবাজারেই শেষ হয়ে গেছে। উপায় না দেখে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সাহায্য নেন রেখা, ধারদেনা করেন। তারপর কোলে অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ছুটে আসেন চট্টগ্রামে।
রেখা রানী বলেন, মেয়ের জন্মের পর আমার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। চার বছর অনেক চিকিৎসার পর এই ছেলেটার জন্ম হয়। ও যখন তিন মাসের, তখনই তার বাবা ধরা পড়ে যায়। জন্মের পর থেকেই বাবার আদর-সোহাগ থেকে বঞ্চিত আমার ছেলেটা।
কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন রেখা রানী দাশ। গলা বারবার ধরে আসছিল। কখনও চোখের পানি মুছছিলেন, কখনও থেমে যাচ্ছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টানে ভাঙা কণ্ঠে তিনি শুধু একটি প্রশ্নই বারবার করছিলেন- ‘আমার ছেলেটা কী একটু চিকিৎসা পাইলেই বাঁচত না?’
হাসপাতালে তাদের এ দূরবস্থা দেখে পাশে দাঁড়ান সংবাদকর্মী অর্পন চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, এই নারী এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছিলেন যে, তাকে ভরসা দেওয়ারও কেউ ছিল না। এমনকি গুরুতর অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম আসার জন্যও কাউকে পাচ্ছিলেন না। পরে পাবেল কান্তি দে নামে রেখার দূর-সম্পর্কের আত্মীয় তার সঙ্গে আসেন।
পাবেল কান্তি দে বলেন, ওনার সঙ্গে আসার মতো ঘনিষ্ঠ কোনো আত্মীয় ছিল না। মানবিক কারণে আমি সঙ্গে আসি। প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আইসিইউ সংকটের কারণে সেখানে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে শেষ ভরসা হয় বেসরকারি হাসপাতাল। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে একদিন চিকিৎসার পরই বিল আসে ৪২ হাজার টাকা। পরে শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে অন্য একটি হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানে ৯ মাস বয়সী শিশুটি।
পাবেল কান্তি দে জানান, আইসিইউতে চিকিৎসার পর হাসপাতালের বিল আসে ৮৪ হাজার টাকা। অনেক অনুরোধ করার পর ২০ হাজার টাকা কমানো হয়। এরপর শিশুটির মরদেহ নিয়ে আমরা কুতুবদিয়ায় ফিরে যাই।
চট্টগ্রামে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবেই এক ডজন ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, রোগীর চাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও বিশেষায়িত শয্যার সংখ্যা।
ফলে সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে আর্থিক সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে। চিকিৎসা ব্যয়ের ভার নিতে গিয়ে কেউ জমি বিক্রি করছে, কেউ ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছে, আবার কেউ হারিয়ে ফেলছে জীবনের শেষ সম্বলটুকুও। রেখা রানী দাশের কাছে এখন সবকিছুই যেন শূন্য। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।
অর্থ সংকটের কারণে ১৪ মাস বয়সী শিশু সাইফনের বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেননি মা কাউসার বেগম। তিনি বলেন, গত সাতদিন ধরে হাম ওয়ার্ডে আমার বাচ্চা চিকিৎসাধীন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়া এবং অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়ায় গত চারদিন আগে আইসিইউতে ভর্তি করা হলেও আবারো তাকে ওয়ার্ডের বেডে পাঠিয়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা। এখন বিভিন্ন টেস্ট করার জন্য বলেছে। কিন্তু আমার কাছে এত টাকা নেই যে সেই টেস্টগুলো করাব।
চমেক হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের শিশুদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, হাম আক্রান্ত বা উপসর্গ আছে এমন প্রায় সব শিশুই জ্বরে আক্রান্ত এবং নিউমোনিয়ার সংক্রমণ আছে। এর পাশাপাশি শিশুদের অক্সিজেন লেভেলও কমে যাওয়ায় বেশির ভাগ শিশুকেই অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে নেবুলাইজার ব্যবহার করার পাশাপাশি স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, চমেকের আইসিইউ থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত কিংবা উপসর্গ নিয়ে যারা ভর্তি হয়েছে তাদের গুরুত্বের সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোতে সার্বক্ষণিক নার্সরা কাজ করছেন। ওয়ার্ডে জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসক উপস্থিত থাকছেন।
গত কয়েকদিন চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে হামে আক্রান্ত রোগী ও স্বজনদের উপচে পড়া ভিড়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) এর নিচতলার ১নং ওয়ার্ডে অস্থায়ীভাবে ৫০টি বেড স্থাপন করে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ৪ রুমের এই ওয়ার্ডটির প্রায় প্রত্যেক বেডেই দুই থেকে তিনজন করে হামের আক্রান্ত শিশুকে সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম কালবেলাকে বলেন, হামে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগী নিম্নআয়ের হওয়াতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে তারা চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে না, যার কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চাপ একটু বেড়েছে। যার কারণে কিছু কিছু বেডে ১/২ জন রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানান, প্রায় প্রতিদিন ১০০ জনের উপরে হামে আক্রান্ত শিশুকে তারা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২৫ জন শিশু এই ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কোনো রোগী আসলে তাকে দ্বিতীয় তলা ৯নং ওয়ার্ডের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগে ভর্তি করানো হয় কারণ ওই ওয়ার্ডের পাশেই শিশুদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (আইসিইউ) বিভাগ। কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। আর রোগীর অবস্থা ভালোর দিকে গেলে নিচতলায় হামের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
তবে শিশুদের আইসিইউ বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে বেড আছে ২০টি, যার মধ্য থেকে ১৫টি বেডকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। এতো রোগীর জন্য আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও হাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডা. ফারহানা জেরিন কালবেলাকে বলেন, কোভিডকালে আমরা দেখেছি একটা পর্যায়ে রোগীর আইসিইউর প্রয়োজন হতো, হামের ক্ষেত্রে তা কিছুটা কম কারণ হামে আক্রান্ত অনেক শিশু বেডে থেকেই সুস্থ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র গুরুতর শ্বাসকষ্টে থাকা শিশুগুলোকেই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। বিভাগীয় হাসপাতাল হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেলকে বিশাল পরিমাণের রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হয় সেই হিসেবে চাপটাতো একটু বেশিই থাকবে স্বাভাবিক। তবে আমরা যতটুকু পারছি চেষ্টা করছি।
তবে আক্রান্ত রোগীর স্বজনদের অভিযোগ কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল হাম আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি নিচ্ছে না যার কারণে বাধ্য হয়ে তারা সরকারি হাসপাতালে ভিড় করছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জানান, আমরা বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে অনুরোধ করেছি তারা যেন বিনা চিকিৎসায় কোনো রোগী না ফেরান। চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতাল, মেরিন সিটি হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এইসবগুলোতে হামের রোগী রাখছে বলে জেনেছি। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিলও যেন নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখে এইটা নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি।