

নওগাঁয় চলমান আকস্মিক বন্যার পানির তীব্র স্রোতে রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার সংযোগস্থল ‘বান্দাইখাড়া বয়তুল্ল্যাহ’ সেতুর উত্তর পাশের সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) ধসে গেছে।
এর ফলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যে কোনো মুহূর্তে পুরো সড়কটি নদীতে বিলীন হয়ে চার উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আত্রাই নদীর ওপর অবস্থিত এই সেতুটির দক্ষিণ প্রান্ত আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া বাজারে এবং উত্তর প্রান্ত রাণীনগর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারে সংযুক্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে ২০১৫ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। পরবর্তীতে গত ২-৩ বছর আগে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক মেরামত, সিসি ব্লক স্থাপন ও রং করাসহ বিভিন্ন সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। এই সেতুটিকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।
কিন্তু হঠাৎ করে আকস্মিক বন্যায় অতিরিক্ত পানির স্রোতে সেতুর উত্তর পাশের এপ্রোচ সড়কের একটি বড় অংশ ধসে যাওয়ায় তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন চারটি উপজেলার চলাচলরত জনসাধারণ। কারণ এই সেতুটি দিয়ে প্রতিদিন আত্রাই, রাণীনগর, মান্দা এবং পার্শ্ববর্তী রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার হাজার হাজার মানুষসহ বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ জনগণ ও যানবাহন চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগ সড়কটির এমন বেহাল দশায় চরম ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন চার উপজেলার লাখো মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দাইখাড়া বয়তুল্ল্যাহ সেতুর ঠিক রাণীনগর উপজেলার অংশে উত্তর পাশেই চলাচলরত সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে বড় ধরনের ধসের সৃষ্টি হয়েছে। কার্পেটিংয়ের একাংশ ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। সড়কটি বর্তমানে এতটাই সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, ভারী ও হালকা যানবাহনসহ পথচারীদের চলাচলেও চরম আতঙ্ক কাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, দ্রুত এই ধসের অংশ মেরামত করা না হলে পুরো সড়কটি নদীতে বিলীন হয়ে চার উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
স্থানীয় যুবক মো. পরশ আলী জানান, এই সড়কটি দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন। কারণ প্রায় দুই-আড়াই বছর আগেও এখানে ধসে গিয়ে এমন গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে এক অপরিচিত ব্যক্তি সেই গর্তে পড়ে প্রাণ হারিয়ে ছিলেন। এরপর ধসে যাওয়া সেই গর্ত মাটি দিয়ে সাময়িকভাবে পূরণ করা হয়। তবে এবার আশা করবো জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হবে। কারণ এই সেতুটি নদীর ওপর নির্মিত। কাজেই প্রাকৃতিক বন্যা হতে পারে এটাই স্বাভাবিক। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে পরিকল্পনা করে সংস্কার করা।
আত্রাই উপজেলার হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও আত্রাই উপজেলা বিএনপির প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন তরফদার বলেন, বান্দাইখাড়া ব্রিজটি আমাদের এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও শিক্ষার্থী এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ব্রিজের উত্তর পাশের ধস এখন সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, যেন বিলম্ব না করে দ্রুত মধ্যে এই ধস সংস্কার করে রাস্তাটি চলাচলের উপযোগী করা হয়।
রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রাসেল সরকার বলেন, এই সেতুটি হওয়ার ফলে জামালগঞ্জ বাজারে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বান্দাইখাড়া ও জামালগঞ্জ বাজারে যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ জনগণ চলাচল করে থাকে। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় সড়কে ধস দেখা দেওয়ায় আমরা আতঙ্কে আছি। বিষয়টি নিয়ে আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলবো। এছাড়া আমাদের নওগাঁ-৬ আসনের এমপি শেখ রেজাউল ইসলাম রেজু ভাইকেও অবগত করবো। আশা করা যায় আমাদের এমপি খুব দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেবেন।
এ বিষয়ে রাণীনগর উপজেলা প্রকৌশলী ইসমাইল কালবেলাকে বলেন, বান্দাইখাড়া বয়তুল্ল্যাহ সেতুর পাশের সড়ক ধসে যাওয়ার বিষয়টি জানা মাত্রই অফিস থেকে লোক পাঠানো হয়েছে। তারা এখনও ওখানে আছে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এর আগেও মেরামত করা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত পানির স্রোতে নিচের মাটি সরে গিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে খুব দ্রুতই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শুরু জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাকিবুল হাসান বলেন, বান্দাইখাড়া ব্রিজের পাশের রাস্তা ধসে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যেহেতু এই সড়ক দিয়ে একাধিক উপজেলার মানুষ যাতায়াত করেন তাই জনগণের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ সচল রাখা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ইতোমধ্যেই উপজেলা প্রকৌশলীকে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। জনসাধারণের ভোগান্তি ও দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুতই সেখানে সংস্কার কাজ শুরু হবে।
নওগাঁ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বদরুদ্দোজা মোবাইলে নিশ্চিত করেছেন যে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে টেকসই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।