

কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দেশে প্রায় দেড় হাজার কৈশোরবান্ধবসেবা কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সেবাগ্রহীতাদের উপস্থিতি বাড়াতে চারটি জেলার ২০টি কেন্দ্রে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার (ভিপিএল) মডেল চালু করা হয়। এতে সেবাগ্রহীতার উপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, ভিপিএল মডেলে কিশোর-কিশোরীদের সাথে কাজ করেন ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকরা। তরুণ-তরুণীরা তাদের প্রায় সমবয়সী ভলান্টিয়ারদের সাথে নিজেদের সমস্যার কথা প্রকাশে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। মডেলটি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কার্যকর, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং টেকসই উদ্যোগ। মডেলটি সারা দেশে চালু করা হলে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় পরিবর্তন ঘটবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে সিরাক-বাংলাদেশ ও জিএইচএআই অ্যাডভোকেসি অ্যাক্সিলারেটর আয়োজিত কৈশোরবান্ধব সেবা কেন্দ্রে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেল বিষয়ক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. নাজমুল হাসান বলেন, দেশে প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। উদ্বেগজনকভাবে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসা ঘাটতি ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র দশমিক শূন্য ৭৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং দশমিক ১২ মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন।
অন্যদিকে, জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হওয়ায় মানসম্মত ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে অংশগ্রহণকারীরা কিশোর-কিশোরীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেলকে একটি কার্যকর, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং টেকসই উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, সহিংসতা এবং অন্যান্য সামাজিক ঝুঁকির সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বিষয়গুলোতে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শুরু করা উচিত এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ বিষয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
তারা উল্লেখ করেন, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতোই বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানা ও সেবা পাওয়া কিশোর-কিশোরীদের মৌলিক অধিকারের অংশ হওয়া উচিত। ১৩–১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য-ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের বিদ্যমান সেবা-ব্যবস্থার পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)-এর আওতায় ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার (ভিপিএল) মডেল বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। এতে সরকারি উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে কমিউনিটি পর্যায়ে সহজলভ্য ও কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
আয়োজকরা জানান, ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার ২০টি কৈশোরবান্ধবসেবা কেন্দ্রে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেল পরিচালনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার ছয় কেন্দ্রে সেবা গ্রহণ করে ১২৫৪ জন কিশোর ও কিশোরী।
কিন্তু ২০২৩ সালের নভেম্বরে দেখা যায়, এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৩৭২ জনে পৌঁছায়। নারায়ণগঞ্জের চারটি কেন্দ্রে ৫২৬ জন থেকে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে ১৯১০ জনে পৌঁছায়। ময়মনসিংহের ৮টি কেন্দ্রে ১৮৩০ জন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭৭৪ জনে। এবং নেত্রকোনার ২টি কেন্দ্রে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ৫০৫ জন থেকে বেড়ে ৬৩৭ জনে পৌঁছায়।
মতবিনিময় সভায় সিরাক-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এসএম সৈকত ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেলের প্রয়োজনীয়তা, এর বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা এবং নীতিগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রোগ্রাম লিড শাহীনা ইয়াসমিন ও উপ-পরিচালক (প্রোগ্রাম) মো. সেলিম মিয়াসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।