

ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি শহর বান্দা। এ বছর বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ স্থান হিসেবে আলোচনায় এসেছে। মে মাসে শহরটিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৪৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। জলবায়ুবিদ ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেরার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সাতবার পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ স্থান হিসেবে তালিকায় ছিল বান্দা।
ইউরোপজুড়ে চলা তাপপ্রবাহ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও ভারতের মতো দেশগুলোতে আরও ভয়াবহ গরমে মানুষের দৈনন্দিন জীবন কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে, সেই চিত্র তুলে ধরেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
৭০ বছর বয়সী মুন্নি দেবী প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে তার চার ছেলেকে নিয়ে বান্দার সবজি বাজারে কাজ শুরু করেন। তখনই তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি বলেন, প্রতি বছরই গরম বাড়ছে, তবে এ বছরের পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন।
মুন্নি দেবী বলেন, গরম সবারই লাগে। কিন্তু আমাদের যে পরিস্থিতি, তাতে কাজ না করে উপায় নেই।
তিনি জানান, দুপুরে কাজ শেষে বাড়ি ফিরলেও স্বস্তি মেলে না। কারণ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে সিলিং ফ্যানও চলে না। গরমে কিছুটা স্বস্তি দিতে তার নাতি-নাতনিদের প্রতিদিন পাইপের পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়।
শুধু মানুষ নয়, এই তীব্র গরমে বিপদে পড়েছে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীও। ৭০ বছর বয়সী প্রাণিপ্রেমী শোভারাম কাশ্যপ স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ১৫ হাজারের বেশি কাঠের পাখির বাসা বসিয়েছেন। পাশাপাশি পাখিদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় পানিভর্তি মাটির পাত্রও রাখা হয়েছে।
এদিকে, তাপপ্রবাহের কারণে বান্দার সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপও বেড়েছে। হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ডা. অভিষেক প্রণায়ামি বলেন, প্রতি গ্রীষ্মেই রোগীর সংখ্যা বাড়ে, তবে এবার তা আগের সব বছরের চেয়ে বেশি। হাসপাতালে প্রতিদিন পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন।
রাতেও তাপমাত্রা খুব বেশি থাকায় অনেকের পক্ষে ঘরে ঘুমানো সম্ভব হয় না। তাই অসংখ্য মানুষ বান্দা রেলস্টেশনের খোলা প্ল্যাটফর্ম, রাস্তার পাশে কিংবা ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন। শিশুদের নিয়ে অনেক পরিবারও স্টেশনে আশ্রয় নিচ্ছে, কারণ খোলা জায়গায় অন্তত কিছুটা বাতাস পাওয়া যায়।
জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অভিয়ান্ত তিওয়ারি বলেন, বান্দায় সবসময়ই গরম পড়ত। তবে এখন তাপমাত্রার তীব্রতা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে রাতের উচ্চ তাপমাত্রা মানুষের শরীরকে দিনের গরম থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।
বান্দার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অমিত আসেরি জানান, প্রশাসন কুলিং সেন্টার চালু করেছে, বিপুল পরিমাণ ওরস্যালাইন বিতরণ করছে এবং হাসপাতালগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, মাটির আর্দ্রতা ও সবুজায়নের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে পানি সরবরাহ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
তবে তার মতে, এটি শুধু বান্দার সমস্যা নয়। তিনি বলেন, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। আমরা তারই ভুক্তভোগী।
সূত্র: ইউরো নিউজ