রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম
আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সিএনএন-এর বিশ্লেষণ

সমঝোতা চুক্তি ঘিরে ইরানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভ্যুত্থানের অভিযোগ কট্টরপন্থিদের

ইরানের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তিকে ঘিরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো অভিযোগ করছে, যুদ্ধকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং চুক্তি স্বাক্ষরকারী নেতারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শ থেকে সরে গিয়ে নরম অবস্থান গ্রহণ করেছেন। আলোচকদের এমন অবস্থানের কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ তুলেছেন দেশটির কট্টরপন্থিরা।

সম্প্রতি তেহরানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। সেখানে উপস্থিত একদল শোকাহত মানুষ খামেনিকে শ্রদ্ধা জানানোর পরিবর্তে প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে ‘আপসকারীর মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেন।

একই জানাজায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও ক্ষোভের মুখে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া এই কূটনীতিককে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয় এবং তাকে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ইরানের কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে বর্তমান নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছে। তাদের দাবি, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশ অমান্য করেই এই চুক্তি করা হয়েছে।

তবে মোজতবা খামেনি এখনো প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা দিয়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি আড়ালে রয়েছেন বলে সরকারি ব্যাখ্যা থাকলেও, কট্টরপন্থীদের একটি অংশের দাবি তিনি কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে চলে গেছেন অথবা তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রাখা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিই যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতির সুযোগে এই নেতাদের বিরুদ্ধেই এখন কট্টরপন্থিরা অভ্যুত্থানের অভিযোগ তুলছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরান বিশেষজ্ঞ আরাশ আজিজির মতে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ না থাকায় কট্টরপন্থিরা গালিবাফ ও পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ছড়াচ্ছে।

খামেনির জানাজায় ব্যাপক উপস্থিতি ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকদের। তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার দাবি তোলে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে করা যেকোনো সমঝোতার বিরোধিতা করে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ইরানের বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালায় এবং কার্যত যুদ্ধবিরতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থিরা আবারও সরকারকে চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানায়।

চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই কট্টরপন্থিরা সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দিতে শুরু করেছিল। এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকারপন্থী নীতির সমালোচনা করে এক নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বক্তা মোহাম্মদ আলি বখশি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে উদ্দেশ করে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার শর্ত মানা না হলে তার জন্য নরক তৈরি করা হবে। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, জনাব রাষ্ট্রপতি, যদি নেতার শর্তগুলো পূরণ না করা হয়, তাহলে আমরাই হবো তরবারি আর আপনার গলা থাকবে তাতে। তবে এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কট্টরপন্থিদের অভিযোগ, গালিবাফ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতা বাড়িয়ে সংসদ ও সর্বোচ্চ নেতার ভূমিকা খর্ব করার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, এভাবেই ধাপে ধাপে একটি রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন থেকে মাহমুদ নাবাভিয়ানসহ চুক্তিবিরোধী দুই কট্টরপন্থি সদস্যকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নাবাভিয়ানই প্রথম প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার নথি ফাঁস করে চুক্তি ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি এবং তার সমর্থকেরা ‘জেবহে-ই পায়দারি’ বা ‘এনডিউরেন্স ফ্রন্ট’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ রক্ষার দাবিদার এই গোষ্ঠী নিজেদের সুপার রেভল্যুশনারি হিসেবে পরিচয় দেয় এবং বর্তমান নেতৃত্বকে সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত বলে মনে করে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, বর্তমান ক্ষমতাকাঠামো ধীরে ধীরে এই কট্টরপন্থিদের প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করছে। কারণ তাদের অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে।

যদিও সংখ্যায় তারা খুব বেশি নয়, তবু সংসদ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কট্টরপন্থি নেতা সাঈদ জালিলি এক কোটিরও বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন, যা তাদের রাজনৈতিক ভিত্তিরও ইঙ্গিত দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষমতার ভেতরে গভীর বিভাজন রয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এই তিন বিষয়ে এখনো নেতৃত্বের মধ্যে মৌলিক ঐকমত্য রয়েছে।

তবুও মোজতবা খামেনির দীর্ঘ অনুপস্থিতি, যুদ্ধবিরতি নিয়ে শর্তসাপেক্ষ অবস্থান এবং বিপ্লবী গার্ডের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কট্টরপন্থিদের আরও সাহসী করে তুলেছে। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কট্টরপন্থি নেতা মানুচেহর মোত্তাকি সম্প্রতি টেলিভিশনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কোনো সামরিক ঘাঁটি থেকে শতাধিক মার্কিন সেনাকে বন্দি করে ইরানে নিয়ে আসাই হবে সবচেয়ে কার্যকর জবাব।

কালবেলা
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আর্জেন্টিনা নাকি স্পেন, কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপের ট্রফি? সুপারকম্পিউটারের চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণী

সংস্কৃতিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে চাই: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

ফ্যাসিস্টদের পকেট ভরার সব রাস্তা বন্ধ করা হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

বিশ্বমানের শিক্ষা সম্প্রসারণে ‘সিডনি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের’ ভিশন-৩০ উন্মোচন

ট্রলার থেকে পড়ে কলেজছাত্রের মৃত্যু

২৩ জুলাই থেকে ঢাকায় তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষামেলা

সড়ক নির্মাণকাজের মান নিয়ে এনসিপি-ঠিকাদারির মধ্যে সংঘর্ষ

শ্রাবণ সন্ধ্যায় বর্ষার সুরে মুখর ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন  

রাজধানীতে সৌদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাক্তন ছাত্র সমিতির প্রীতি সম্মিলন অনুষ্ঠিত

ঢাবি শিবিরের কর্মসূচিতে ব্যারিস্টার আরমানের মোবাইল চুরি, থানায় জিডি

১০

স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা: কার কোথায় শক্তি, কোথায় দুর্বলতা

১১

ঢাবি শিবিরের কর্মসূচিতে ব্যারিস্টার আরমানের মোবাইল চুরি 

১২

আপ্লুত মেসি, ইনস্টা-ভিডিওতে কি বার্তা দিলেন?

১৩

শহীদ মীর মুগ্ধের নামে খুবিতে নতুন আবাসিক হল নির্মাণের ঘোষণা এমপির

১৪

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের ৫ ঘণ্টা র‌্যাগিং

১৫

চট্টগ্রাম বন্দরে ভারী গাছ খালাসে দুর্ঘটনা, অল্পের জন্য রক্ষা

১৬

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ইসলামী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য: গোলাম পরওয়ার

১৭

মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর ‘মূল্যহীন ও অবৈধ’: মোজতবা খামেনি

১৮

ইতালীয় ভাস্করের হাতে তৈরি বিশ্বকাপ ট্রফি, কীভাবে হয়ে উঠল ফুটবলের আইকন?

১৯

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা নওশাদ গ্রেপ্তার

২০
X