

বাংলাদেশ একটি নীরব কিন্তু দ্রুত প্রসারমাণ জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা এবং ক্যানসারের মতো বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, যা পরিবার, স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার গ্রহণের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের খাদ্য-ব্যবস্থা এবং খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, চিনিযুক্ত পানীয় এবং অন্যান্য অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা বহুগুণে বেড়েছে। এগুলো এখন সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা।
তবে গবেষণা বলছে, এসব খাবারে সাধারণত অতিরিক্ত পরিমাণে লবণ, চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যেগুলো বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। প্যাকেটজাত খাবারে পুষ্টি তথ্য প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষর ও জটিল সংখ্যায় দেওয়া থাকে। সব ভোক্তার পক্ষে তাত্ক্ষণিকভাবে এগুলো পড়ে বোঝা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না।
অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভোক্তারা এসব পণ্যের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত থাকেন। এই তথ্যগত ঘাটতি বা সীমাবদ্ধতা সহজে দূর করতে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং হলো এমন একটি খাদ্য-লেবেলিং ব্যবস্থা, যেখানে কোনো খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলে প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট, সহজ ও বোধগম্য সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। ফলে ভোক্তা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং বা অস্পষ্ট পুষ্টি তথ্যের ওপর নির্ভর না করে স্বচ্ছ, সহজ ও স্পষ্ট সতর্কবার্তার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচনে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে, শক্তিশালী নিউট্রিয়েন্ট প্রোফাইলিং মডেলের (এনপিএম) ভিত্তিতে গৃহীত সতর্কীকরণ এফওপিএল একটি কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ।
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা এবং অসংক্রামক রোগের উদ্বেগজনক বিস্তারের পরিসংখ্যানই বলে দেয় দেশে সতর্কীকরণভিত্তিক এফওপিএল ব্যবস্থা প্রবর্তন কতটা জরুরি। বর্তমানে প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে এবং প্রায় ১ কোটি ৩৯ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সবমিলিয়ে বছরে প্রায় ৫ লক্ষ ৭০ হাজার ২৬৩ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ এবং এর মধ্যে ১৯ শতাংশই অকালমৃত্যু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২,৮৩,৮০০ মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগের কারণে। তরুণদের মধ্যেও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের হার ক্রমাগত বাড়ছে, যা উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় পরিবার ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের অতি-প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বহুল ব্যবহৃত প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার শনাক্ত করতে ২০২৫ সালে দেশব্যাপী ৯৭৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের মধ্যে পরিচালিত একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করে থাকেন। একই গবেষণায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৪টি খাদ্য ক্যাটাগরির আওতায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ৬৩ শতাংশে উচ্চমাত্রায় লবণের (সোডিয়াম) উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালের অপর এক গবেষণায় দেশে প্রচলিত ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার (চিপস, চানাচুর, ডাল ভাজা ও মটর ভাজা, নুডলস, বিস্কুট, লজেন্স/ললিপপ, মিল্ক চকলেট, চাটনি, আইসক্রিম) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলোতে লবণ (সোডিয়াম), চিনি ও চর্বির মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৈনিক নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
এছাড়া ৪৬% প্যাকেটে স্যাচুরেটেড ফ্যাট সম্পর্কিত তথ্য, ৩৮% প্যাকেটে ট্রান্সফ্যাট সম্পর্কিত তথ্য এবং ২১% প্যাকেটে চিনি ও লবণের তথ্য পাওয়া যায়নি এবং কোন প্যাকেটেই লবণ (সোডিয়াম), চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাটের সঠিক পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। এরকম পরিস্থিতিতে ভোক্তার পক্ষে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন করা কঠিন। তবে, বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ এফওপিএল এক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
শতকরা হিসাব বের করা, কঠিন পরিভাষা বোঝা বা দীর্ঘ উপাদান তালিকা বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে, প্যাকেটের সামনের সহজ সতর্কবার্তা দ্রুত জানিয়ে দেয় কোনো পণ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ (সোডিয়াম) বা সম্পৃক্ত চর্বি আছে কিনা। ফলে ক্রয়ের মুহূর্তে ভোক্তারা অধিক তথ্যভিত্তিক ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হন।
এফওপিএল একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি। বিশ্বের ৪৪টি দেশ বাধ্যতামূলক বা স্বেচ্ছামূলক এফওপিএল পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছে। চিলি, মেক্সিকো, উরুগুয়ের মতো বিভিন্ন দেশে বাধ্যতামূলক এফওপিএল চালুর পর অস্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার প্রবণতা কমেছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বলছে, সহজ ও দৃশ্যমান সতর্কবার্তাভিত্তিক এফওপিএল ভোক্তাদের সঠিক ও স্পষ্ট তথ্য দেয় এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশও বাধ্যতামূলক এফওপিএল প্রবর্তনে সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে, যেখানে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়-এর প্যাকেটের সামনে কালো অষ্টাভুজাকারে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি’ লেখা সতর্কবার্তা (এফওপিএল) প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। এখন প্রয়োজন নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে খসড়াটি দ্রুত চূড়ান্তকরণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। এফওপিএল প্রবর্তন যত দেরি হবে খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগের প্রকোপ ততই বাড়তে থাকবে। অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা ৩.৪ অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে।
কেবল হাসপাতাল বানিয়ে, ডাক্তারের সংখ্যা বাড়িয়ে এবং চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলানো সম্ভব নয়, টেকসই সমাধান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং এক্ষেত্রে এফওপিএল একটি ব্যয়-সাশ্রয়ী পদক্ষেপ।
লেখক: শামসুন্নাহার মহুয়া, চিফ নিউট্রিশনিস্ট, বারডেম হাসপাতাল; শবনম মোস্তফা, প্রোগ্রাম অফিসার, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)।