রহমান মৃধা
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

রমজান : আত্মশুদ্ধি, মানবিক ঐক্য এবং বিশ্বশান্তির আহ্বান

রহমান মৃধা। ছবি : সংগৃহীত
রহমান মৃধা। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের আকাশে চাঁদ উঠেছে। কোথাও গতকাল, কোথাও আজ। ভৌগোলিক সময় ভিন্ন হলেও আধ্যাত্মিক সময় এক। মুসলমানদের জন্য রমজান শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রমজান কি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক গভীর বার্তা বহন করে?

ইসলামের মূল ধর্মগ্রন্থ কোরআনে বলা হয়েছে, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পারো। এখানে একটি গভীর সত্য আছে। রোজা নতুন কোনো বিধান নয়। এটি মানব ইতিহাসের ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক অনুশীলনের অংশ।

রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ক্ষুধার কষ্ট দেওয়া নয়, বরং ক্ষুধার মাধ্যমে আত্মাকে জাগিয়ে তোলা। মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকে সংযত করে, তখন সে নিজের ভেতরের অহঙ্কারকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। সে উপলব্ধি করে, খাদ্য আমার অধিকার হলেও তা আমার একার নয়। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় সহমর্মিতা। যে ব্যক্তি দিনের পর দিন পরিপূর্ণ আহার পায়, সে হয়তো দরিদ্রের বেদনা বুঝতে পারে না। কিন্তু রোজা তাকে এক দিনের জন্য হলেও সেই অনুভূতির কাছে নিয়ে যায়।

প্রশ্ন হতে পারে, রোজা কি শুধু ইসলাম ধর্মের মানুষের জন্য?

উপবাস কেবল ইসলামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইহুদিধর্মে ইয়োম কিপুরে উপবাস রয়েছে। খ্রিস্টধর্মে লেন্ট পালিত হয়। হিন্দুধর্মে একাদশী ব্রত প্রচলিত। বৌদ্ধধর্মেও নির্দিষ্ট দিনে উপবাস ও ধ্যান রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। অন্যান্য ধর্মের মানুষের জন্যও কি ঐশী বার্তা এসেছে?

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ এক এবং মানবজাতির ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবীর মাধ্যমে ঐশী নির্দেশনা এসেছে। কুরআনে উল্লেখ আছে যে, প্রত্যেক জাতির কাছেই সতর্ককারী প্রেরিত হয়েছে। অর্থাৎ ঐশী দিকনির্দেশনা কোনো একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল এবং কোরআন এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামী ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, এমন বহু নবী ও বার্তাবাহক এসেছেন যাদের নাম ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় যে নৈতিক শিক্ষা, একত্ববাদী ধারণা বা উচ্চতর সত্যের অনুসন্ধান দেখা যায়, তা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো মানব উদ্ভাবন হিসেবে নয়, বরং ঐশী প্রেরণার বিস্তৃত ধারার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

যবুর মূলত নবী দাউদকে দেওয়া গ্রন্থ, যা আধ্যাত্মিক সঙ্গীত ও প্রার্থনার সংকলন হিসেবে পরিচিত। এটি আইন প্রণয়নধর্মী নয়, বরং হৃদয়ের ভাষায় প্রার্থনার গ্রন্থ। তাই প্রায়ই আলোচনা করতে গিয়ে মানুষ তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআনের কথা বেশি বলে, কারণ এগুলো বিধান ও নির্দেশনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু যবুর এই ধারাবাহিক ঐশী বার্তারই একটি অংশ।

এই গ্রন্থগুলোতে যে নীতিগুলো পুনরাবৃত্ত হয়েছে তা হলো একত্ববাদ ন্যায়বিচার দান দায়িত্ব জবাবদিহি

মানুষের ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ভূগোল, ভিন্ন সংস্কৃতি এই নীতিগুলোকে আলাদা রূপ দিয়েছে। ইতিহাসের রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বও বিভাজন তৈরি করেছে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, মানুষের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা একই। মানুষ চায় ন্যায়, চায় অর্থপূর্ণ জীবন, চায় পরম সত্যের সংস্পর্শ।

কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের সার্বজনীন ছায়া

ইসলামে কলেমা বিশ্বাসের ঘোষণা। নামাজ নিয়মিত উপাসনা। রোজা আত্মসংযম। হজ তীর্থযাত্রা। জাকাত দানব্যবস্থা।

অন্যান্য ধর্মেও আমরা সমান্তরাল ধারণা দেখি। বিশ্বাস ঘোষণা আছে। উপাসনার নির্দিষ্ট সময় আছে। উপবাস আছে। তীর্থযাত্রা আছে। দান আছে। রূপ আলাদা, কিন্তু নৈতিক চেতনা একই। মানুষ নিজেকে সীমিত সত্তা হিসেবে স্বীকার করে এবং উচ্চতর সত্যের কাছে নত হয়। এই নত হওয়ার মধ্যেই মুক্তি।

এখন প্রশ্ন তাহলে মতভেদ কেন?

মতভেদ মানুষের চিন্তার স্বাভাবিক পরিণতি। ব্যাখ্যা আলাদা হবে, কারণ অভিজ্ঞতা আলাদা। সংস্কৃতি আলাদা হবে, কারণ ইতিহাস আলাদা। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মতভেদ অহংকারে রূপ নেয়। যখন আমি ভাবি আমার ব্যাখ্যাই একমাত্র সত্য, তখন বিভাজন সৃষ্টি হয়। যদি আমরা সব ধর্মগ্রন্থ গভীরভাবে পড়ি, দেখবো একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। সত্যের অনুসন্ধান বিনয় দাবি করে। কোনো গ্রন্থই ঘৃণা শেখায় না। মানুষ ঘৃণা তৈরি করে। ধর্ম মানুষকে উন্নত করতে আসে, শাসন করতে নয়; সংযুক্ত করতে আসে, বিচ্ছিন্ন করতে নয়।

রমজান : আত্মজাগরণ থেকে সামাজিক ন্যায়ের পথে

রমজান আমাদের শেখায় ক্ষুধা সহ্য করতে। কিন্তু আরও বড় শিক্ষা হলো অন্যের ক্ষুধা বোঝা। পৃথিবীর বহু দেশে এমন মানুষ আছে যারা প্রতিদিন অনিচ্ছায় রোজা রাখে, কারণ তাদের খাবার নেই। যদি একজন মানুষ রমজানে নিজের বিলাসী ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ দিয়ে অন্তত একটি পরিবারের জন্য ইফতার নিশ্চিত করে, তাহলে রোজা সামাজিক ন্যায়ের রূপ পায়। রমজান আমাদের শেখায় নীরবতা। কিন্তু আরও বড় শিক্ষা হলো অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকা। রমজান আমাদের শেখায় আত্মসংযম। কিন্তু আরও বড় শিক্ষা হলো ক্রোধ ও বিদ্বেষ সংযম করা। সামাজিক মাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য না করা, প্রতিবেশীর ধর্মকে হেয় না করা, কর্মস্থলে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, এগুলোও রোজার বাস্তব প্রয়োগ।

আমি মুসলিম পরিবারে জন্মেছি। সেটি আমার পরিচয়ের অংশ। কিন্তু মানবজাতি আমার বৃহত্তর পরিচয়। ইসলামের শিক্ষা আমাকে শিখিয়েছে, একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করা। তাই রমজান যদি আমাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, তবে সেটি আমাকে মানুষের দিকেও নিয়ে যাবে। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা মানুষের প্রতি দায়িত্ব ছাড়া পূর্ণ হয় না। এই মাসে আমরা যদি সত্যিই রোজা রাখি, তবে শুধু খাদ্য থেকে নয়, ঘৃণা থেকেও বিরত থাকি। শুধু পানীয় থেকে নয়, অন্যায় থেকেও বিরত থাকি। শুধু দেহ নয়, মনকেও পরিশুদ্ধ করি।

আজ পৃথিবী নৈতিক সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তি উন্নত, কিন্তু সহমর্মিতা কমে যাচ্ছে। অর্থ বেড়েছে, কিন্তু আস্থা কমেছে। শক্তি বেড়েছে, কিন্তু শান্তি কমেছে। এই বাস্তবতায় রমজান কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি নৈতিক পুনর্জাগরণের সুযোগ। যদি বিশ্বের প্রতিটি মানুষ, সে মুসলমান হোক বা না হোক, অন্তত এক মাস নিজের ভোগ কমিয়ে অন্যের কথা ভাবতে শেখে, তবে পৃথিবীর মানচিত্র বদলাতে সময় লাগবে না।

তাহলেই রমজান ক্যালেন্ডারের একটি মাস হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে মানবতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বিশ্বশান্তির সম্ভাবনা তখন আর কল্পনা থাকবে না, তা হয়ে উঠবে সম্মিলিত নৈতিক সিদ্ধান্ত।

মাহে রমজানের এই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের উদ্দেশে একটি আন্তরিক আহ্বান জানাতে চাই। আমরা মতাদর্শে ভিন্ন হতে পারি, রাজনৈতিক অবস্থানে ভিন্ন হতে পারি, কিন্তু আমরা একই মাটির সন্তান। এই মাসে অন্তত ঘৃণার ভাষা কমাই, পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়াই, অন্যের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে ন্যায়, সততা ও সহমর্মিতাকে অগ্রাধিকার দিই। যদি আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামান্য হলেও নৈতিক সাহস দেখাই, তবে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক শক্তিতেও সমৃদ্ধ হবে।

রমজান হোক আমাদের আত্মশুদ্ধির, মানবিক ঐক্যের এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের পথে নতুন অঙ্গীকারের সূচনা।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

কালবেলা/এমএ
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিখোঁজের চারদিন পর বন্ধ ঘর থেকে ববি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীকে মারধর, দুই ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কার

ডিমলায় বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার, উদ্বেগে অভিভাবক ও সচেতন মহল

বিকেলে বাবার দাফন, রাতে এটিএম বুথে ডিউটি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা

জুলাই শহীদদের স্মরণে ঢাবি কেন্দ্রীয় মসজিদে ছাত্রদলের দোয়া ও মিলাদ বুধবার

বিয়ে নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি, জামায়াত এমপির গোমর ফাঁস করলেন কাজী  

থাইল্যান্ডে আন্তঃদেশীয় অপরাধ সম্মেলন শেষ, কর্মব্যস্ত সময় কাটালেন আইজিপি

রাজধানীতে বিএনপি কর্মীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা

আরএফএল কর্মীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার, সহকর্মী পলাতক

অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা, হাঙ্গেরিতে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু

১০

নতুন বাংলাদেশ গড়তে এনসিপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: হাসনাত আব্দুল্লাহ

১১

‘রাজনৈতিক বিভেদের ঊর্ধ্বে থেকে আইনজীবীদের কল্যাণে কাজ করতে হবে’

১২

বিশ্বকাপ ফাইনালের মারামারিতে যে শাস্তি পেতে পারেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা

১৩

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়তে চান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট, দাবি ট্রাম্পের

১৪

হুতিদের হুমকির মুখে লোহিত সাগর থেকে ফিরে গেল ২ সৌদি জাহাজ

১৫

চুক্তি আগস্টে / এবার এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনছে সরকার

১৬

উন্নয়ন কোনো দলের নয়, জনগণের অধিকার: মান্নান

১৭

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাদের প্রার্থী হতে সুযোগ দেবে না ইসি

১৮

কুয়াকাটায় বসতবাড়ি থেকে পদ্ম গোখরা উদ্ধার

১৯

ইরানে হামলা না চালালে আজ ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকত না: ট্রাম্প

২০
X