

হঠাৎ দেখে থমকে গেলাম। ছোট্ট একটা পৃথিবী। ১২টা তার ফ্যাক্টরি এবং মাত্র ৩জন কর্মচারী। কে সেই সুন্দর, কে?
একটু সময় নিয়ে ভাবতেই ধাঁধাটা মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। ছোট্ট এক পৃথিবী, ১২টা ফ্যাক্টরি, তিনজন কর্মচারী। কী হতে পারে? হঠাৎ চোখ পড়ল সময়ের দিকে। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বারোটা। মুহূর্তেই ধাঁধার দরজা খুলে গেল।
তখন বুঝলাম, ঘড়ি শুধু একটি যন্ত্র নয়, এক প্রতীক। যেমন একটি ঘড়ির ভেতরে বারোটি ঘর সময়কে ধারণ করে, তেমনি মানুষের শরীরও এক সুসংগঠিত ক্ষুদ্র পৃথিবী। আমাদের দেহের ভেতরে আছে অসংখ্য কার্যকর ইউনিট, হৃদয়, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, যকৃত, কিডনি, হাড়, পেশি, রক্তনালি, লিম্ফ, ত্বক, ইমিউন সিস্টেম এবং হরমোনাল নিয়ন্ত্রণ। প্রতিটি নিজ নিজ দায়িত্বে অবিচল, অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য।
আর বাহ্যিক কর্মীরা, মুখ, চোখ, হাত-পা, মন, মাথা, অনুভূতি, তারা যেন সেই দৃশ্যমান প্রতিনিধি। ভেতরের অদৃশ্য শ্রমকে তারা ভাষা দেয়, রূপ দেয়, আচরণে প্রকাশ করে। এই সীমিত অথচ কেন্দ্রীয় চালকেরাই প্রতিদিনের কাজ, প্রতিক্রিয়া, উপলব্ধি এবং নৈতিক সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দেয়।
যখন ঘড়ি ঠিক সময় দেখায়, আমরা নির্ভয়ে তার ওপর ভরসা করি। আমাদের দিন, সিদ্ধান্ত, গন্তব্য, সবকিছু তার কাঁটার নির্দেশ মেনে চলে।
কিন্তু যদি ঘড়ি ভুল সময় দেখাতে শুরু করে, তখন আমরা থেমে যাই। কারণ ভুল সময় মানে ভুল সিদ্ধান্ত।
তখন আমাদের সামনে থাকে দুটি পথ। প্রথম, তাকে সার্ভিস করি, যত্ন নিই, ভেতরের ত্রুটি খুঁজে ঠিক করি। যতক্ষণ না সে আবার নির্ভুল নির্দেশ দিতে পারে। দ্বিতীয়, যদি বুঝি সে আর তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, তবে তাকে সরিয়ে দিই। কারণ একটি অকার্যকর ঘড়ি শুধু নিষ্ক্রিয় নয়, বিভ্রান্তিকরও।
ঘড়ির কাজ একটাই, সঠিক সময় জানানো। তার সীমা আছে, তার দায়িত্ব স্পষ্ট। ঘড়ি দিয়ে সাইকেল চালানো যায় না, আবার সময়হীন ঘড়ি দিয়ে পথচলাও নিরাপদ নয়।
মানুষের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আমাদের বাহ্যিক অঙ্গ এবং অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের মূল্য তাদের উপস্থিতিতে নয়, তাদের সঠিক ব্যবহারে। সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক সামঞ্জস্য ছাড়া মানুষও দিকনির্দেশ হারায়। আর দিকনির্দেশহীন মানুষ নিজের জন্য যেমন বিপজ্জনক, সমাজের জন্যও তেমনি বিভ্রান্তির কারণ।
মানুষের চোখ, মুখ, হাত-পা, মন, মাথা, এরা শুধু অঙ্গ নয়। এরা আমাদের প্রকাশের দরজা, আমাদের বিবেকের ভাষা, আমাদের প্রতিক্রিয়ার সেতু। চোখ দেখে শুধু দৃশ্য নয়, অন্যায়ও দেখে। মুখ উচ্চারণ করে শুধু শব্দ নয়, সত্য কিংবা নীরবতার সিদ্ধান্তও। হাত-পা চলে শুধু পথের দিকে নয়, দায়িত্বের দিকেও। মন ও মাথা তৈরি করে শুধু চিন্তা নয়, অবস্থান।
অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের সঙ্গে এই বাহ্যিক শক্তিগুলোর সংযোগ যত সামঞ্জস্যপূর্ণ, ব্যক্তি তত সুসংগঠিত, সমাজ তত স্থিতিশীল। ভেতরের নৈতিক স্পন্দন আর বাইরের আচরণের মিল যত পরিষ্কার, জীবন তত নির্ভুল।
কিন্তু যখন এই শক্তিগুলো ভুল পথে ব্যবহৃত হয়, যখন চোখ দেখে অথচ অস্বীকার করে, মুখ জানে অথচ চুপ থাকে, হাত সক্ষম অথচ সরিয়ে রাখে, মন সুবিধার হিসাব কষে আর মাথা আপসের যুক্তি দাঁড় করায়, তখন বিভ্রান্তি শুরু হয়।
তখন মানুষও ঘড়ির মতো ভুল সময় দেখাতে থাকে। ভুল নির্দেশ দেয়। আর সেই ভুল নির্দেশ একসময় ব্যক্তি থেকে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে নিয়ে যায় অবক্ষয় ও ধ্বংসের দিকে।
চব্বিশের সেই গণঅভ্যুত্থানের আগুন আমাদের এখনও স্মরণ করায়, আগুন শুধু জ্বালায় না, আলোকিতও করে। সেই আগুনে যারা প্রতিশ্রুতির ভাষায় মানুষের ফিরে আসার অধিকার খুলে দিয়েছিল, যারা সাহসকে সামনে এনে পথ তৈরি করেছিল,
তাদের প্রতি যদি আমরা অবহেলা করি, তাদের স্বপ্নের ভিতরে যদি অবিশ্বাসের ছুরি বসাই, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত বেইমানি নয়। সেটি বিশ্বাসের শেকড়ে আঘাত। সেটি ভবিষ্যতের জন্য কঠিন এবং দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা।
মানুষ একবার প্রতারিত হলে তার ভেতরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার সে সহজে কাঁধ বাড়ায় না। বিপদের দিনে যে ফিরে তাকায় না, তার জন্য বিপদের সময়ও কেউ অপেক্ষা করে না।
এই কারণেই মানবদেহের ইনার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বাহ্যিক কর্মীদের সমন্বয় এতো গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ঘড়ি সঠিক সময় না দিলে পুরো দিনটাই বিপর্যস্ত হয়, ঠিক তেমন মানুষের ভেতরের নৈতিক স্পন্দন আর বাইরের আচরণের সামঞ্জস্যই নির্ধারণ করে জীবন ও সমাজের দিকনির্দেশ।
যথাযথ ব্যবহার, সচেতন মনোযোগ এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা ছাড়া ঘড়ি যেমন বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, মানুষও তেমনি অকার্যকর এবং শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ফিরে আসে।
কে বেইমান নয়? সাধারণ মানুষ কি নিঃসংকোচে বলতে পারে, তার হাতে কোনো ফাঁকি নেই? ক্রেতা, বিক্রেতা, প্রশাসন, শিক্ষক, আমরা প্রত্যেকে কি নির্ভয়ে বলতে পারি, আমি বেইমান নই?
যে অন্যায় দেখেও চুপ থেকেছি, যে সত্য জেনেও উচ্চারণ করিনি, যে সুবিধার জন্য নীরবতার আশ্রয় নিয়েছি, সেই নীরবতাও কি এক ধরনের বেইমানি নয়?
বেইমানি কেবল অন্য কারও গল্প নয়। এ আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। আমার ভেতরের সুবিধাবোধ, আমার ভয়, আমার আপসের আরেক নাম। বেইমান সে তো আমারই আরেক মুখ, যাকে আয়নায় দেখলে হঠাৎ নিজের চোখকেই অপরিচিত মনে হয়।
তাই বিচার শুরু করার আগে, আঙুল তোলার আগে, একবার বুকের ভেতর তাকাই।
হয়তো সেদিনই বেইমানির সংজ্ঞা বদলাবে, যেদিন আমরা স্বীকার করতে শিখব, বেইমান সে অন্য কেউ নয়, বেইমান সে আমারই আমি।
কারণ যত মূল্যবানই হোক একটি ঘড়ি, যদি তা সঠিক সময় দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সে আর ঘড়ি নয়, কেবল একটি অলংকার।
ঠিক তেমনই মানুষ, যদি তার কথায় মিথ্যা, আচরণে দুর্নীতি, কর্মে অবহেলা, অন্তরে সুবিধাবাদ, ভয় এবং স্বার্থ একসাথে বাসা বাঁধে, তবে সে মানুষ রয়ে যায় কেবল আকৃতিতে, অর্থে নয়।
একটি জীবন যদি কেবল নিজের সুবিধা, অন্যের প্রতি অবিশ্বাস, নৈতিক দায় এড়ানো আর আপসের ভেতর ক্ষয় হয়, তবে তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই অকার্যকর এবং বিপজ্জনক বাস্তবতায় পরিণত হয়।
সত্যিকারের মানুষ হতে হলে যেমন আমরা একটি ঘড়িকে নিয়মিত পরীক্ষা করি, প্রয়োজনে সার্ভিস করি, যতক্ষণ না তা সঠিক সময় দেখায়, তেমনি আমাদেরও নিয়মিত নিজের ভেতরের নৈতিকতা, সিদ্ধান্ত এবং আচরণকে যাচাই করতে হবে। পুনর্নবীকরণ করতে হবে বিবেককে।
নচেৎ ঘড়ি যেমন পথভ্রষ্ট করে, মানুষও তেমনি দিকহীন হয়ে পড়ে। আর দিকহীন মানুষ কেবল নিজেকেই নয়, সমাজকেও বিপদের দিকে ঠেলে দেয়।
রমজানের মাস আত্মশুদ্ধির মাস। এই লেখায় নিজের আত্মার সমালোচনাকেই তুলে ধরলাম একটি শিক্ষণীয় দিক হিসেবে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন