কৌশিক আজাদ প্রণয়
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

নারী : অবদমন থেকে মর্যাদার অভিযাত্রা 

কৌশিক আজাদ প্রণয়। ছবি : সংগৃহীত
কৌশিক আজাদ প্রণয়। ছবি : সংগৃহীত

নারী : অবদমন থেকে মর্যাদার অভিযাত্রা

নারী ইতিহাসের সঙ্গে সময়ের এক অবিরল সন্নিবেশ, এক চলিষ্ণু স্রোতধারা। মানবসভ্যতার সমগ্র গতিপথে নারী কেবল একটি সামাজিক পরিচয় নয়; বরং মানবজীবনের অনুভব, বোধ, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রেম ও ভালোবাসা, হিংসা ও দ্বেষ, স্পৃহা ও মনন, স্বাধীনতা ও শৃঙ্খল, যুদ্ধ-বিগ্রহ, স্তুতি ও শান্তি—মানবজীবনের এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার প্রতিটি স্তরেই নারীর উপস্থিতি গভীরভাবে নিবিড়। শতাব্দী ও সহস্রাব্দ অতিক্রম করে নারী তাই মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক চিরন্তন চরিত্র হয়ে রয়েছে। সৃষ্টির সূচনা থেকে আজ অবধি মহাকালের ধারাবাহিকতার সঙ্গে নারীর উপস্থিতি সমান্তরালভাবে এগিয়ে এসেছে দৃপ্ত ও অনিবার্য ভঙ্গিতে। অথচ এই নারীসত্তার প্রতিই অবজ্ঞা, অবহেলা, বৈষম্য এবং সামাজিক ব্যবস্থার চাপিয়ে দেওয়া নিপীড়ন ও বঞ্চনা মানবসমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। এই অবমাননা প্রকৃতপক্ষে কেবল নারীর প্রতি নয়; বরং তা মানবসভ্যতার স্বাভাবিক বিকাশের বিরুদ্ধেই এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।

ইতিহাস, সাহিত্য, পুরাণ, বিজ্ঞান ও দর্শন—মানবজ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবস্থান ও কৃতিত্ব এক অবধারিত সত্য। মানবসভ্যতার নান্দনিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে নারীর উপস্থিতি কখনোই প্রান্তিক নয়। পাশ্চাত্যের ট্রয় যুদ্ধের কাহিনিতে হেলেন, অ্যাথেনা, হেরা কিংবা আফ্রোদিতির মতো চরিত্রগুলো যেমন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, তেমনি প্রাচ্যের মহাকাব্যিক বর্ণনায় দ্রৌপদী, কুন্তী, গান্ধারী কিংবা ধীবরকন্যা সত্যবতীর মতো চরিত্রগুলোও ইতিহাস ও সাহিত্যের ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এসব চরিত্র কেবল পৌরাণিক বা সাহিত্যিক কল্পনার অংশ নয়; বরং তারা মানবসমাজে নারীর শক্তি, প্রজ্ঞা ও অস্তিত্বের প্রতীক। পৌরাণিক গরিমার সীমানা ছাড়িয়ে ইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই নারী তার নিজস্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে।

ধর্মীয় বর্ণনাতেও নারীশক্তির স্বীকৃতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বহু ধর্মীয় কাহিনি ও উপাখ্যানে নারীর সাহস, শক্তি ও নৈতিক দৃঢ়তার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। হিন্দু পুরাণে এমন এক অসুরের কাহিনি উল্লেখ করা হয় যে মহাদেবের বরপ্রাপ্ত হওয়ায় কোনো পুরুষশক্তি বা কোনো অস্ত্র তাকে পরাস্ত করতে সক্ষম ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাকে বধ করতে হয়েছে দেবী পার্বতীর বীরত্বে। যে শক্তি কখনো নারীর কাছে পরাজয়ের সম্ভাবনাও কল্পনা করেনি, সেই শক্তিকেই পরাজিত হতে হয়েছে নারীর সাহস ও শক্তির কাছে। এই কাহিনি ধর্মীয় বর্ণনার মধ্য দিয়েই নারীশৌর্যের এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠে।

খ্রিষ্টধর্মেও কুমারী মাতা মেরির মাধ্যমে যিশুর জন্মদানের যে ঐশ্বরিকতা বর্ণিত হয়েছে, তা নারীর মর্যাদা ও পবিত্রতার এক গভীর প্রতীক। একইভাবে ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে হযরত ফাতিমা এবং হযরত আয়েশার জীবন ও ভূমিকা মুসলিম সমাজে নারীর মর্যাদা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। এই সব ধর্মীয় ঐতিহ্য প্রমাণ করে যে মানবসভ্যতার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশেও নারী একটি অপরিহার্য শক্তি।

কিন্তু ইতিহাসের এই স্বীকৃতি সত্ত্বেও বাস্তব সমাজে নারীর অবস্থান সবসময় সেই মর্যাদা পায়নি। সময়ের প্রবাহে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ধীরে ধীরে এমন এক মানসিকতা গড়ে তুলেছে যেখানে নারীর ব্যক্তিসত্তা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে কেবল ভোগ্য বস্তু বা অন্দরমহলের সীমাবদ্ধ জীবনে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা সমাজে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে মানবসমাজের অগ্রগতির নানা পর্যায়ে নারীকে তার মৌলিক মানবিক মর্যাদার জন্যই সংগ্রাম করতে হয়েছে।

সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সমরবিদ্যা কিংবা রাজনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর গৌরবময় অবদান রয়েছে। তবুও এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজের একটি বড় অংশ এখনও দ্বিধাগ্রস্ত। নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রায়ই পুরুষতান্ত্রিক উপহাস ও তাচ্ছিল্যের মুখে পড়ে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বহু সমাজে যৌনতাকে ন্যাক্কারজনকভাবে ব্যবহার করে নারীর সম্ভ্রমকে আঘাত করার প্রবণতা দেখা যায়। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অপমান তাই কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং তা সামাজিক অবক্ষয়েরই প্রতিফলন।

অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নারী কখনোই পিছিয়ে থাকেনি। ইতিহাসে অসংখ্য নারী রয়েছেন যারা শিক্ষা, স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তবুও বাস্তবতা হলো, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামো অনেক সময় নারীর অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রতিষ্ঠা। নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এই উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা তাই আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

নারীকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি একটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার এবং সভ্যতার অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য শর্ত। শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যে পূর্ণ পৃথিবীকে প্রতিহত করার জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত শক্তিই প্রয়োজন। নারীর প্রতি সম্মান এবং নারীর প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব যখন সমাজ তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সক্ষম হবে।

নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে চরমপন্থী অবস্থানও কখনো কখনো সমস্যার সৃষ্টি করে। “মেয়েরাও মানুষ” এই অবমাননাকর ধারণা যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি প্রতিক্রিয়াশীল আবেগে “মেয়েরাই মানুষ” ধরনের একপাক্ষিক উচ্চারণও মানবিক সমতার ধারণাকে বিকৃত করে। মানবসভ্যতার মৌলিক সত্য হলো নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। সৃষ্টির প্রতিটি ক্ষেত্রে এই সমতা ও সহাবস্থান অনিবার্য।

দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম ও সামাজিক কাঠামোকে নতুন করে পর্যালোচনা করার সময় এখন এসেছে। সমাজে নারীর নিরাপত্তা, আর্থিক সক্ষমতা এবং স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা গেলে নারীশক্তির বিকাশ আরও সুদৃঢ় হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপব্যবহার করে নারীর অধিকার ও মর্যাদাকে খর্ব করার চেষ্টা দেখা যায়। এই প্রবণতা প্রতিহত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি প্রতিকূল সময়ে পুরুষ যেমন সংগ্রাম করেছে, তেমনি নারীর ত্যাগ ও অবদানও কোনো অংশে কম নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে নীরব ত্যাগ ও অদৃশ্য শ্রমের মাধ্যমে নারীই সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে তাই নারীর প্রতি সম্মান, দায়িত্ব ও অধিকারের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ন্যায্যতা ও সমতা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত অগ্রগতির পথ। সেই পথেই নারী তার পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ফিরে পেতে পারে এবং মানবসভ্যতা তার প্রকৃত ভারসাম্য ও সৌন্দর্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘হান্নান মাসউদের তিন কোটি টাকার ডিল’ সংক্রান্ত অভিযোগকারীর বাড়িতে হামলা

গোমস্তাপুর / শূন্যরেখার ২৮ নারী-পুরুষ ও শিশুর কান্না কেউই শুনছে না, বৃষ্টিতে ভিজেই রাত পার

পদ ছাড়লেন কলকাতার মেয়র, জানালেন কারণ

নদ-নদীতে ইলিশের বিচরণ আটকে দিচ্ছে ‘ডুবোচর’, ভরা মৌসুমেও আকাল

‘মব সৃষ্টি করে’ গ্রেপ্তার বিএনপি নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের টার্গেট করছে ছিনতাইকারীরা

‘আসিফ মাহমুদের ঐতিহাসিক পদক্ষেপের সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবল’

‘জামায়াত, এনসিপি ও রুমিন আপার বক্তব্যে বেশ মিল’

রাজধানীতে দুর্বৃত্তের গুলিতে সিটি করপোরেশন কর্মচারী আহত

কেন হাদি হত্যার বিচার চান, ব্যাখ্যা দিলেন ডাকসু নেত্রী জুমা

১০

চোরের মাথা ন্যাড়া করে আঁকা হলো আর্জেন্টিনার পতাকা

১১

হানিফ সংকেতের ‘চৈতন্যে’ জুলাই নাই: সারোয়ার তুষার

১২

ইউরোপ জয়ের অনন্য নজির বাংলাদেশের

১৩

তপুর জোড়া গোলে সান মারিনোকে হারাল বাংলাদেশ

১৪

মারধরের প্রতিবাদ করায় বন্ধুকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ

১৫

সাতক্ষীরায় সীমানা পিলারসহ আটক ৪

১৬

শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সে ফের আগুন

১৭

উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে সরকার

১৮

বিএনপি আবারও আওয়ামী লীগের ফাঁদে পড়েছে : নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী

১৯

পুলিশের উপস্থিতিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল

২০
X