শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ফাহিম মাহমুদ
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

নতুনের আবাহন: ছাত্রদলের আগামীর রাজনীতি ও গুণগত পরিবর্তনের রূপরেখা

ফাহিম আহমেদ।
ফাহিম আহমেদ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিক্রমায় ছাত্র রাজনীতি কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের অপরিহার্য সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে, যখনই এ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো কোনো স্বৈরাচারী শক্তির কবলে নিপাতিত হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সেই লৌহকপাট ভাঙার অগ্রসেনানী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রদল নিজেদের অসামান্য আত্মত্যাগের স্বাক্ষর রেখেছে। বর্তমানে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আগমনী বার্তা কেবল একটি গতানুগতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মূলত দেশের ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ ও গুণগত রূপান্তর নির্ধারণের এক অতিগুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

রক্ষণশীল দার্শনিক এডমান্ড বার্ক যথার্থই বলেছেন, ‘যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের উপায় ধারণ করে না, তা মূলত নিজের অস্তিত্ব সংরক্ষণেরও সক্ষমতা রাখে না।’ ছাত্রদলের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ তত্ত্বটি সমভাবে প্রাসঙ্গিক। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় চরম নিপীড়ন, কারাবরণ এবং কাঠামোগত নির্যাতনের মুখে দাঁড়িয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যে অদম্য সাহসিকতা প্রদর্শন করেছেন, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ’ বা ডেমোক্রেটিক রেসিস্ট্যান্স এর এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

অন্যান্য অনেক সংগঠন যখন আপসের পথে হেঁটেছে, ছাত্রদল তখন রাজপথের অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের সঁপে দিয়ে আন্দোলনের মশাল প্রজ্বলিত রেখেছে। তবে এই ত্যাগের মহিমাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বর্তমানের পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতায় ছাত্রদলকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট এর ভিত্তিতে অগ্রসর হতে হবে।

নতুন নেতৃত্বের সম্মুখভাগের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হলো ‘মিথ্যা বয়ান’ বা ফলস ন্যারেটিভ এর রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলা করা। বিগত বছরগুলোতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে রাজনীতির একটি বিকৃত ও নেতিবাচক চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সত্য-পরবর্তী এই যুগে সুকৌশলী প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তরুণদের একটি বৃহৎ অংশকে মূলধারার রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করার অপপ্রয়াস দৃশ্যমান। জার্মান দার্শনিক হানা আরেন্ট এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘যখন কোনো সমাজ সত্য ও মিথ্যার বিভাজনরেখা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, ঠিক তখনই সেখানে স্বৈরতন্ত্রের শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত হয়।’

সুতরাং ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে কেবল স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মাধ্যমে মিথ্যার দেয়াল চূর্ণ করে একটি সত্য ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ছাত্রদলকে একটি প্রডাক্টিভ ছাত্র সংগঠনে রূপান্তরিত করার সময় সমাগত। সংগঠনের মূলনীতি: শিক্ষা, ঐক্য ও প্রগতি। এটিকে কেবল কাগজে আবদ্ধ না রেখে এর প্রায়োগিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির লক্ষ্য কেবল মিছিল বা সমাবেশ নয়। তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বিদ্যমান কাঠামোগত অন্তরায়গুলো দূরীভূত করতে ছাত্রদলকে নীতি-নির্ধারণী বা পলিসি পর্যায়ে জোরাল ভূমিকা রাখতে হবে। সৃজনশীল অর্থনীতির বর্তমান যুগে একজন শিক্ষার্থী যেন কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে স্বয়ং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বা অন্ট্রপ্রেনর হতে পারে, সেই অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদলকে নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গুণগত পরিবর্তন আনয়ন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ছাত্রদলকে প্রকৃত অর্থেই ‘ভয়েস অব দ্য স্টুডেন্টস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তার ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থে যে ব্যক্তিস্বাধীনতার রূপরেখা দিয়েছেন, তার মূল সুর ধারণ করে ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সুরক্ষিত করা নতুন নেতৃত্বের একটি অপরিহার্য নৈতিক দায়িত্ব। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, নেতৃত্বের প্রকৃত সার্থকতা কেবল ক্ষমতার নিরঙ্কুশ চর্চায় নিহিত নয়; বরং তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার চূড়ান্ত প্রতীকে পরিণত হওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখছে, সেখানে ছাত্রদলের ভূমিকা হবে একজন দক্ষ স্থপতির ন্যায়। নিজেদের ত্যাগ ও বীরত্বের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পাথেয় করে, আধুনিকতা ও মেধার সুসমন্বয়ে ছাত্রদল একটি বৈষম্যহীন শিক্ষাঙ্গন বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, এটিই আজকের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সর্বজনীন প্রত্যাশা। নতুন নেতৃত্বে যারা সমাসীন হচ্ছেন, তাদের জন্য রইল শুভকামনা। ব্যক্তি নয়, বরং আদর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোরই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হোক।

লেখক শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ড (UWE), যুক্তরাজ্য।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সিএন্ডএফ ভবনেই মিলবে চসিকের ট্রেড লাইসেন্স, বুথ স্থাপনের নির্দেশ মেয়রের

নানার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে ২ ভাইয়ের মৃত্যু

নানার বাড়ি থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ, খালে মিলল মরদেহ

দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নিহত ১, একাধিক বাড়িঘরে আগুন

কারাগারে আইভীকে গান শোনাতেন মমতাজ, যে গান না গাইতে অনুরোধ

পাকিস্তানের সিরিজ জয়

ইউক্রেন ছাড় দিলে সমঝোতায় প্রস্তুত রাশিয়া : পুতিন

ডাচদের হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ শেষ বাংলাদেশের

আফগানিস্তানকেও রুখে দিল বাংলাদেশ

দিল্লির হোটেলে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশি নাগরিক

১০

পদোন্নতিতে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে সিআইডি প্রধানের পদত্যাগ

১১

যুবদলের যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক হলেন নির্যাতিত নেতা সাজিদ হাসান বাবু

১২

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তথ্য পেয়ে চুক্তি ও ঋণপত্র বাতিল, ফেরত যাচ্ছে ‘এমটি মেমেই’

১৩

ছবি প্রকাশ করলেন রাশেদ খান / সরকার পতনের পর আ. লীগ নেতাদের সঙ্গে কয়েক ধাপে মিটিং হান্নান মাসউদের

১৪

বজ্রপাতে সারা দেশে প্রাণ গেল ১২ জনের

১৫

অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবি এনসিপির

১৬

দাবি এমপি শওকতুলের / শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান নোবেল পাওয়ার যোগ্য

১৭

আত্মসমর্পণ করে জামিন পেলেন অভিনেতা আলভীর মা

১৮

কোটি টাকার ইয়াবাসহ কোস্টগার্ডের হাতে ৪ জন আটক

১৯

২২ বলের ফিফটিতে দিলারার রেকর্ড

২০
X