

গত ২৮ মে ছিল নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস, ঈদের কারণেই হয়তো সেভাবে আমাদের বিষয়টি চোখে পড়েনি। তবে দিবস এলেই নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে আমরা নানা আলোচনা করি, সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করি, পরিসংখ্যান তুলে ধরি এবং তা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও যথাযথ প্রয়োগ করা।
কারণ এখনো আমাদের দেশে অসংখ্য নারী গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে অপুষ্টি, অবহেলা এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার কারণে ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটান। মাতৃত্ব এখনো অনেক নারীর জন্য আনন্দের পাশাপাশি ভয়, অনিশ্চয়তা এবং কখনো কখনো মৃত্যুঝুঁকির নাম।
নিরাপদ মাতৃত্ব বলতে গর্ভাবস্থা, প্রসব এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে মা ও নবজাতকের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাকে বোঝায়। এর মূল লক্ষ্য হলো মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি কমানো। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও অনিরাপদ মাতৃত্ব ও সন্তান প্রসবজনিত জটিলতায় প্রতি লাখ জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৩৬ জন মা মারা যাচ্ছেন।
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হচ্ছে অপুষ্টি। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক বা গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। দেশের ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। অপুষ্টিজনিত কারণে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার শিশু খর্বাকৃতির শিকার। এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর।
অপুষ্টি শুধু একটি শারীরিক সমস্যা নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান এক ভয়াবহ চক্র। গর্ভাবস্থা থেকে শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে পুষ্টির ঘাটতি হলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীতে আর পুরোপুরি পূরণ করা যায় না। অপুষ্ট শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে এই শিশুরাই বড় হয়ে আবার অপুষ্ট বাবা-মায়ের ভূমিকায় আবর্তিত হয়, ফলে অপুষ্টির দুষ্টচক্র চলতেই থাকে।
বাংলাদেশে অপুষ্টির অর্থনৈতিক প্রভাবও ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টির কারণে দেশে প্রতি বছর কমপক্ষে সাত হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অথচ বহু প্রচারণা ও বিনিয়োগের পরও এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংয়ের হার এখনো প্রায় ৫০ শতাংশে আটকে আছে।
অপুষ্টির পাশাপাশি নিরাপদ মাতৃত্বের আরেকটি বড় সংকট হলো গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবার অভাব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৩’ অনুযায়ী, মাত্র ৩৯ শতাংশ গর্ভবতী নারী প্রসব-পূর্ব চারবার বা তার বেশি স্বাস্থ্যসেবা পান। অর্থাৎ ৬১ শতাংশ নারী এখনো এই মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক; সেখানে ৬৪ শতাংশ গর্ভবতী নারী নিয়মিত গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা পান না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ ও অল্প বয়সে মাতৃত্ব। আমাদের দেশের বহু নারী গর্ভধারণের আগে কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা বা অতিরিক্ত ওজনের মতো ঝুঁকি নিয়েই তারা গর্ভধারণ করেন। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়ায় মা ও গর্ভের সন্তানের জটিলতা সময়মতো শনাক্ত হয় না। গর্ভধারণের সময় অন্তত চার থেকে ছয়বার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বহু নারী সেই সেবা গ্রহণ করেন না। ফলে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণগুলো অদৃশ্যই থেকে যায়।
বাল্যবিবাহও নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে এখনো ১৮ বছরের আগেই ৪২ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়ে যায়। অপ্রাপ্তবয়স্ক মাতৃত্বের কারণে মা ও শিশু— দুজনেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। শারীরিকভাবে পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই মাতৃত্বের বোঝা নিতে গিয়ে বহু কিশোরী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য জটিলতায় আক্রান্ত হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখনো দেশের বড় একটি অংশের সন্তান জন্ম হয় বাড়িতে এবং অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে। মোট প্রসবের ৩৬ শতাংশ এখনো বাসাবাড়িতে অনিরাপদভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ৫৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটে বাড়িতে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারগুলো জটিলতা গুরুতর হওয়ার পর হাসপাতালে নেয়, তখন চিকিৎসকদের করার মতো তেমন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ফলে মায়ের মৃত্যু হয়, অথবা অনেক মা দীর্ঘমেয়াদি প্রজননস্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগেন, যা পরবর্তী পুরো জীবনকে প্রভাবিত করে।
প্রসবের পরও মায়েদের প্রতি অবহেলা কমে না। সন্তান জন্মের পর পরিবারের অধিকাংশ মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই নবজাতকের দিকে চলে যায়। কিন্তু প্রসব-পরবর্তী ৪০ থেকে ৪২ দিনের সময়টি মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময়ে মায়ের পুষ্টি, বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অথচ আমাদের সমাজে নতুন মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি এখনো অনেকাংশেই অবহেলিত।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বৈষম্যের চাপেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী ও শিশুরা। দরিদ্র পরিবারে গর্ভবতী নারীর পুষ্টিকর খাবারকে এখনো অনেক সময় “অতিরিক্ত খরচ” হিসেবে দেখা হয়। ফলে মায়েরা নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের অগ্রাধিকার দেন, আর নীরবে অপুষ্টির শিকার হন।
এই বাস্তবতায় নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্যপরীক্ষা, নিয়মিত প্রসব-পূর্ব সেবা, দক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে নিরাপদ প্রসব, প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাদ্য এবং নারীর প্রতি সামাজিক যত্ন— সবকিছুকে একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য কমাতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
মাতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। একজন মায়ের অপুষ্টি, অযত্ন কিংবা চিকিৎসাহীনতায় মৃত্যু হলে সেটিকে নিছক পারিবারিক ট্র্যাজেডি হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে হবে, সমাজকে এর দায় নিতে হবে। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এখনই অপুষ্টি ও অবহেলার বিরুদ্ধে সমন্বিত লড়াই শুরু করতে হবে ।
লেখক : পরিবেশ ও নারী অধিকার কর্মী