

গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও সকলের মুখেমুখে একটি ঘটনাই আলোচনার কেন্দ্রে-মিরপুরের এক ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের পঁচাগলা মরদেহ। এটি নিছক একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; বরং আমাদের সমাজ, পরিবার, শিক্ষা ও মূল্যবোধের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক কঠিন ও নির্মম বাস্তব প্রশ্ন ।
জন্মিলে মরিতে হইবে এটাই সত্য। কিন্তু একজন মা, একজন প্রবীণ মানুষ, দীর্ঘ সময় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকবেন এবং সেই মৃত্যু চারপাশের মানুষকে তথাকথিত শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের নাড়া দেবে না-এই বাস্তবতা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এখানে উল্লেখ্য তাঁর এক ছেলে যুগ্মসচিব, এক ছেলে দেশের সর্বোচ্চ মেধার দিক থেকে উৎকৃষ্ট বিদ্যাপিঠ বুয়েটের অধ্যাপক। ছোট ছেলে কানাডা প্রবাসী ব্যবসায়ী, যে মেয়ের ফ্ল্যাটে থাকতেন বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগম সে মেয়েও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক এবং মেয়ের জামাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নুরজাহান বেগমের এই মৃত্যু এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয় বরং এটি আমাদের সময়ের, আমাদের সামাজিক চেতনার এবং আমাদের নৈতিক শিক্ষার ব্যর্থতার প্রতীক।
নুরজাহান বেগমের মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের মধ্যে এত আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার কারণ এখানেই। এই ঘটনায় মানুষ শুধু একটি মরদেহ দেখেনি; দেখেছে একাকীত্বের ভয়াবহতা, পারিবারিক সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। মানুষ প্রশ্ন তুলেছে আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? আমাদের উন্নয়নের মানদন্ডই বা কী?
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন শিক্ষার হার বাড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক দূরত্ব। আমরা সন্তানদের সফল হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু সংবেদনশীল হওয়ার শিক্ষা কতটা দিচ্ছি? আমার দেখা একটা বাস্তব উদাহরণ দেই, এইতো সেদিন আমি ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে রাস্তায় হাঁটছি, সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছোট ক্লাসের ছুটি হলো- এক ছোট শিক্ষার্থীর মা রিক্সার মধ্যেই তার ছেলেকে মারছে আর বলছে এই অংকটা না কালকেই তোকে করালাম তাহলে তুই ভুল করলি কেন- কি যে মারা, ছেলে হেসকি দিয়ে কাঁদছে সবাইকে দেখে ছেলেটি লজ্জাও পাচ্ছে কিন্তু মা তার সন্তানকে মেরেই চলছে, পরে শুনলাম ছেলেটি ছাত্র ভাল কিন্তু এবার অংক ভুল হওয়ায় ফাস্ট নাও হতে পারে এ আশংকায় এত মারধর, এত শাসন। ছোট্ট ছেলেটিকেও মনে হচ্ছে নুরজাহান বেগমের ছেলেদের মত বানাতে কঠিন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। মনে হয়, আমরা সন্তানদের শুধুই সফল হওয়ার গুরুত্ব দিচ্ছি, কিন্তু মানবিক উৎকর্ষকে কম গুরুত্ব দিচ্ছি।
নুরজাহান বেগমের ঘটনাটি তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্যাজেডি নয়। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অস্বস্তিকর সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। কারণ আমাদের শিক্ষা মনে হয় মানুষকে শুধু দক্ষ কর্মী, সফল কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবীতে পরিণত করলেও, কিন্তু মনে হচ্ছে তাকে দায়িত্বশীল সন্তান, সহমর্মি মানুষ ও মানবিক নাগরিকে রূপান্তরিত করতে পারছে না, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণতা কোথায়? এটাই কি সত্যিকারের শিক্ষা? যেখানে মা’র প্রতি সন্তানের নেই কোন সহমর্মিতা। শিক্ষাগত সনদ মানুষকে দক্ষ পেশাজীবী বানাতে পারে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মমত্ববোধের বিকল্প হতে পারে না। মিরপুরের এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের নয়; এটি সমগ্র সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আজকেও টিভি স্ক্রলে দেখছিলাম একইরকম আরও এক বৃদ্ধা মা’য়ের মৃত্যুর পর ঘরের ভিতর পচাঁগলা অবস্থায় পড়ে ছিল, নুরজাহান বেগমের মত এরূপ অসহায় মৃত্যু আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি।
আজকের সমাজে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দৃশ্যমান। যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, কিন্তু মানুষের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ কমে গেছে। ঘরে শুয়ে আছে বৃদ্ধ প্রবীণ তাকে বলার এতটুকু সময় নেই বাবা/মা কেমন আছেন বরং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হাজারো বন্ধু আছে, অথচ একই ছাদের নিচে থাকা প্রবীণ মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর জানি, কিন্তু ঘরের এক কোণে নিঃসঙ্গ হয়ে বসে থাকা মানুষটির নিঃশব্দ করুন আকুতি জানি না, জানতে চাই না। মনে হচ্ছে প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানবিক মূল্যবোধ ও মানসিকতা।
এই ঘটনা আমাদের পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন নিয়েও ভাবতে বাধ্য করবে। একসময় পরিবার ছিল আবেগ, দায়িত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরতার একটি প্রতিষ্ঠান। আজ অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার ক্রমশ: একটি নির্জীব কাঠামোয় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। একই বাড়িতে থেকেও মানুষ একে অপরের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। সম্পর্ক আছে, আন্ত: সংযোগ নেই; আত্মীয়তা আছে, কিন্তু আত্মিকতা অনুপস্থিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে কিছু অমানবিক বাস্তবতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। প্রবীণদের একাকীত্ব, মানসিক অবহেলা কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে আর বড় সমস্যা বলে মনে করি না। অথচ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের প্রতি তার আচরণ কেমন তার উপর নির্ভর করে। নুরজাহান বেগমের মৃত্যু তাই একটি সংবাদ নয়; এটি একটি প্রতীক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন কেবল অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তির বিষয় নয়; উন্নয়ন একটি নৈতিক ধারণাও। যে সমাজে প্রবীণরা নিরাপত্তা, সম্মান ও সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন, সেই সমাজের উন্নয়নকে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না।
এই ঘটনার তদন্ত হবে, অলরেডি জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় শুরু করেছে , হয়তো তদন্তে নানা তথ্য সবার সামনে আসবে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন তদন্তের গ-ির বাইরেও যে থেকে যাবে। সেই প্রশ্নগুলো আমাদের প্রত্যেকের জন্য। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু প্রতিযোগিতা শেখাচ্ছি, নাকি সহমর্মীতাও শেখাচ্ছি? আমরা কি কেবল ক্যারিয়ার গড়ছি, নাকি মানুষও গড়ে তুলছি? আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি কেবল আধুনিক হচ্ছি? না এর ঠিক বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছি? এর সঠিক উত্তর জানা খুবই জরুরি। নুরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়তো একদিন সংবাদপত্রের পাতা থেকে হারিয়ে যাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনাও থেমে যাবে। কিন্তু এই মৃত্যু আমাদের সামনে যে আয়নাটি তুলে ধরেছে, তা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সেই আয়নায় প্রতিফলিত মুখটি শুধু একটি পরিবারের নয়; সেটি আমাদের ভঙ্গুর সমগ্র সমাজের প্রতিচ্ছবি।
লেখক : অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার সাহা, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজ, মানিকগঞ্জ
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]