ডা. সাঈদ এনাম
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

চোখের পাতা দিয়ে পুরো উপন্যাস লিখে স্মরণীয় হয়ে আছেন যে সাংবাদিক

ডা. সাঈদ এনাম । ছবি : কালবেলা
ডা. সাঈদ এনাম । ছবি : কালবেলা

একটি ভয়াবহ স্ট্রোক মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছিল তার পুরো শরীরের স্বাধীনতা। বিখ্যাত সেই সাংবাদিক আজীবনের জন্য হয়ে পড়েন শয্যাশায়ী নড়াতে পারতেন না হাত, না পা, না ঠোঁট। শরীর যেন পরিণত হয়েছিল এক নীরব কারাগারে। শুধু একটি চোখের পাতা ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের শেষ জানালা। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেই এক চোখের পলক দিয়েই সহকারীদের সাহায্যে তিনি লিখে ফেলেন একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাহিত্য ইতিহাসে এটি আজও মানব ইচ্ছাশক্তি, চেতনা ও অধ্যবসায়ের এক অবিস্মরণীয় বিস্ময়।

এই অবস্থার নাম লকড-ইন সিন্ড্রোম (Locked-in Syndrome) চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় ও হৃদয়বিদারক স্নায়বিক অবস্থাগুলোর একটি। এখানে রোগী সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন; সব শুনতে পান, বুঝতে পারেন, অনুভব করেন। কিন্তু নিজের শরীর নড়াতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারেন না।

এ যেন না পুরোপুরি জীবিতের স্বাধীনতা, না মৃত্যুর নিস্তব্ধতা, না অচেতনতার অন্ধকার। রোগী কেবল তাকিয়ে থাকেন। আর তার স্থির চোখের পাতার আড়ালে নীরবে জেগে থাকে একটি সম্পূর্ণ সচেতন পৃথিবী। লকড-ইন সিন্ড্রোম কি?

এটি এক দুর্লভ প্রকৃতির ব্রেইন স্ট্রোকের পরবর্তী অবস্থা। এই অবস্থায় রোগী প্রায় পুরোপুরি সচেতন থাকেন, সব শুনতে ও বুঝতে পারেন, কিন্তু নিজের শরীর নড়াতে পারেন না। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে রোগী কোমায় আছেন কিংবা কিছুই বুঝছেন না। অথচ বাস্তবে তিনি চারপাশের প্রতিটি শব্দ, কান্না, স্পর্শ ও কথোপকথন অনুভব করেন। শুধু স্বাভাবিক পদ্ধতিতে অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলেন — তবে চোখের পলক বা উল্লম্ব দৃষ্টি (ওপর-নিচে) দিয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জানাতে পারেন।

এই অবস্থার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ফরাসি সাংবাদিক জিন ডোমিনিক ববি (Jean-Dominique Bauby)। স্ট্রোকের পর তার পুরো শরীর প্রায় অবশ হয়ে যায়, তিনি অনুভূমিক দিকে (আড়াআড়ি) চোখ নড়াতে পারতেন না, কিন্তু উল্লম্ব দিকে (ওপর-নিচে) নড়াতে পারতেন এবং কেবল চোখের পলক ফেলতে পারতেন। সেই উল্লম্ব দৃষ্টি ও পলক দিয়েই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত বই The Diving Bell and the Butterfly। তার সহকারীরা একে একে অক্ষর উচ্চারণ করতেন, আর তিনি চোখের পলকে অক্ষর নির্বাচন করতেন। কল্পনা করুন, একটি সম্পূর্ণ বই, শুধু একটি চোখের পাতার ইশারায় লেখা! কেনো হয়?

লকড-ইন সিন্ড্রোম সাধারণত ব্রেইনস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পনসের (Pons) ভেন্ট্রাল (সামনের) অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে হয়। পনস মস্তিষ্কের চিন্তা ও শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে সেতুর মতো কাজ করে। যখন স্ট্রোক, রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে এই অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কের চেতনা অক্ষত থাকলেও শরীরে নির্দেশ পৌঁছানোর পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে রোগী সব বুঝতে পারেন, কিন্তু হাত-পা, মুখ কিংবা শরীর নড়াতে পারেন না। (খুবই বিরল ক্ষেত্রে ব্রেইনস্টেমের অন্য অংশেও ক্ষত হতে পারে, তবে মূল কারণ পনসের সামনের অংশ)

এই রোগের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, রোগী নিজের শরীরের ভেতর যেন বন্দি হয়ে যান। তিনি ব্যথা অনুভব করতে পারেন (যদিও তা সব ক্ষেত্রে এক রকম নাও থাকতে পারে), বিরক্ত হন, ভালোবাসা বোঝেন, একাকিত্বে কষ্ট পান, কিন্তু তা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারেন না। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা ভুল করে ভাবেন রোগী অচেতন। অথচ তিনি হয়ত সব শুনছেন। তাই লকড-ইন রোগীর পাশে কথা বলার সময় সম্মান, ধৈর্য ও মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখবেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোমা (অচেতন) আর লকড-ইন (সচেতন কিন্তু অবশ) সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা — একজন কোমায় থাকা রোগী চোখ খোলেন না, কিন্তু লকড-ইন রোগী চোখ খোলেন এবং উল্লম্ব দৃষ্টি বা পলকে অর্থপূর্ণ সাড়া দিতে পারেন।

তবে এই অন্ধকার অবস্থার মাঝেও আশার আলো আছে। অনেক রোগী চোখের পলক, উল্লম্ব চোখের নড়াচড়া কিংবা আধুনিক আই-ট্র্যাকিং ও ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে শেখেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে মানুষের চেতনা ও ইচ্ছাশক্তি কত গভীর ও বিস্ময়কর হতে পারে। কখনো কখনো একটি ক্ষীণ চোখের পলকই প্রমাণ করে দেয়, নীরব শরীরের ভেতর এখনো জেগে আছে একটি সম্পূর্ণ সচেতন পৃথিবী।

ডা. সাঈদ এনাম সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি) (ডিএমসি কে-৫২, বিসিএস-২৪)

কালবেলা
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এই ১৪টি কারণ আপনার ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে

সৌদির মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর প্রাণহানি

পদ্মার ভাঙনে বিলীন শত শত বিঘা ফসলি জমি

কুয়েতের তেল স্থাপনায় বারবার হামলা ইরানের, আহত একাধিক

গাজায় জানাজার নামাজে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা, নিহত ১৪

হৃদয়ের ‘লাপাত্তা’য় নুসরাত ফারিয়া

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজে প্রাথমিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

অবশেষে সেই ‘শিশু’র ছবি নিয়ে নীরবতা ভাঙলেন মেসি

তীব্র নদীভাঙনে দুই সপ্তাহে বিলীন ২৫ বসতবাড়ি

১০

রাত ১টার মধ্যে বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে যেসব অঞ্চলে

১১

প্রথমবারের মতো বেসরকারি স্পেস রকেট উৎক্ষেপণ করল ভারত

১২

থাইল্যান্ডে ১৫ কোটি বছর আগের নতুন প্রজাতির ডাইনোসরের সন্ধান 

১৩

বিশ্বকাপে ফিফার আয়ে জোয়ার, বড় অঙ্কের লভ্যাংশ পাচ্ছে বাংলাদেশ

১৪

পাট ক্ষেতে ব্যবসায়ীর মরদেহ, শরীরে মাখানো রাসায়নিক কীটনাশক

১৫

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান থেকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস চীনের

১৬

এক্স-রে’তে ধরা পড়ল পেটের ভেতরের ইয়াবা, গ্রেপ্তার মাদক কারবারি

১৭

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াই আজ, এ ম্যাচের গোল কি গোল্ডেন বুটের হিসাবে যোগ হবে?

১৮

বরিশাল সদর বিএনপির কমিটিতে আ.লীগ-জামায়াত সংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ

১৯

শিক্ষামন্ত্রীর কাছে এমপিও বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান দ্রুত এমপিওভুক্তির দাবি এমপি টিপুর

২০
X