

ফসলকে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হলো রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় ধ্বংস করা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১,০০০টিরও বেশি ধরনের কীটনাশক ব্যবহৃত হয়, যেগুলোর প্রত্যেকটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও বিষক্রিয়ার ধরণ আলাদা আলাদা।
বেশিরভাগ কীটনাশক এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে তা পোকামাকড়ের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করতে পারে। কিছু কীটনাশক সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি, আবার কিছু প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া রাসায়নিকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত অধিকাংশ কীটনাশক পোকামাকড়ের স্নায়ুকোষের মধ্যে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম আয়নের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে দেয়।
ফলে স্নায়ুকোষগুলো ঠিকমতো সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্নায়ু সংকেত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে স্নায়ু ভুলভাবে কাজ করতে থাকে। এই দুই অবস্থার যেকোনো একটিই শেষ পর্যন্ত পোকামাকড়কে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
তবে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার পৃথিবীতে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়ে পরিনত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরে এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব। উচ্চমাত্রায় কীটনাশকের সংস্পর্শে এলে গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনকি মৃত্যুও পর্যন্ত ঘটতে পারে। এ কারণেই কৃষকদের কীটনাশক ছিটানোর সময় বিশেষ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে হয়।
অতীতে কিছু কীটনাশক শুধু মানুষের জন্যই নয়, পুরো পরিবেশের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ডাইক্লোরো-ডাইফেনাইল-ট্রাইক্লোরোইথেন (ডিডিটি বা DDT)। ১৯৪০ সালের দিকে এটি প্রথম আধুনিক কৃত্রিম কীটনাশক হিসেবে উদ্ভাবিত হয়েছিল। বর্তমানে কৃষিতে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ম্যালেরিয়া ও টাইফাসের মতো পোকাবাহিত রোগ দমনের উদ্দেশ্যে ডিডিটি ব্যবহার শুরু হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি নিজেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়। উচ্চমাত্রায় ডিডিটির সংস্পর্শে এলে বমি, শরীর কাঁপা, এমনকি খিঁচুনিও পর্যন্ত হতে পারে।
ডিডিটি পোকামাকড় মারতে অত্যন্ত কার্যকর হলেও এর আরেকটি ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য ছিল জৈবসঞ্চয়ন (Bioaccumulation)। অর্থাৎ, কোনো পাখি যদি ডিডিটি-আক্রান্ত মৃত পোকা খায়, তাহলে সেই রাসায়নিক তার শরীরে জমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষ শরীরে জমে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যার সৃষ্টি করে। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর একটি হলো—পাখির ডিমের খোলস অস্বাভাবিকভাবে পাতলা হয়ে যায়।
ফলে তা ডিমে তা দেওয়ার সময়ই ভেঙে যায় এবং নতুন বংশধর জন্ম নেওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে অনেক পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণে যুক্তরাজ্যে ১৯৮৪ সালে ডিডিটি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এখনো বিশ্বের কিছু দেশে এটি সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বর্তমানে বাজারে আসা শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সাধারণত ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই ভালোভাবে ধোয়া ও পরিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ (Pesticide Residue) পরীক্ষা করা হয়, যাতে খাদ্যে থাকা রাসায়নিকের মাত্রা মানুষের জন্য নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকে।
মৌমাছির সংকট মৌমাছিকে পৃথিবীর পরিবেশব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী বলা হয়। বিশেষ করে পরাগায়নের মাধ্যমে তারা বহু ফসলের উৎপাদনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। আমরা যে খাদ্য খাই, তার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মৌমাছির পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষকের জন্য মৌমাছি এক অর্থে বিনা খরচের দক্ষ শ্রমিক।
কিন্তু বর্তমানে নিওনিকোটিনয়েড (Neonicotinoids) নামের এক ধরনের রাসায়নিক কীটনাশক মৌমাছির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এই কৃত্রিম কীটনাশক ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে অত্যন্ত কার্যকর হলেও এটি শুধু লক্ষ্যবস্তু পোকামাকড়কেই আক্রমণ করে না; উপকারী মৌমাছিও এর শিকার হয়।
নিওনিকোটিনয়েড পোকামাকড়ের স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যু ঘটায়। এই রাসায়নিক উদ্ভিদের পরাগেও থেকে যেতে পারে। ফলশ্রুতিতে ফুলে বসার সময় মৌমাছির শরীরে এটি লেগে যায় এবং ধীরে ধীরে তাদের মৃত্যুর কারণ হয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এমনকি এই রাসায়নিকের কাছাকাছি থাকলেও মৌমাছির দিকনির্ণয় করার ক্ষমতা এবং প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
এই ঝুঁকির কারণে ২০১৩ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোতে নিওনিকোটিনয়েডের ব্যবহার আংশিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১৮ সালে খোলা মাঠে এই রাসায়নিকের সব ধরনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশ এখনো একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। যদিও দেশটির পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (EPA) এসব কীটনাশকের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে।
সূত্র: স্কট ডাটফিল্ড (হাউ ইট ওয়ার্কস, ১ নভেম্বর ২০২১)
লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস