

১৮ মাস ধরে নিখোঁজ থাকা গাজার এক যুবক ঈদ নাঈল আবু শা’কে কারাগারে পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের অফার কারাগারে তাকে আটক রাখা হয়েছে। ওই যুবক নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করেছিল তার পরিবার।
শুক্রবার (০৯ মে) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাঈলের পরিবার গাজার বিভিন্ন জায়গায় তার মরদেহ খুঁজেছে এবং মৃত্যু সনদের আবেদন করেছে। এমনকি নিখোঁজ হওয়ার দশ মাস পর শোক পালনের জন্য তাঁবুও টানিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এক আইনজীবী ফোন করে জানান, নাঈল জীবিত আছেন এবং ইসরায়েলের অফার কারাগারে আটক রয়েছেন।
আলজাজিরা জানিয়েছে, এই খবর দেড় বছরের অসহনীয় খোঁজাখুঁজির অবসান ঘটালেও এটি গাজার হাজারো পরিবারের ভয়াবহ বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখনো গাজার অসংখ্য পরিবার তাদের নিখোঁজ স্বজনদের কোনো খবরের অপেক্ষায় আছে। অনেক পরিবার জানেই না, তাদের প্রিয়জনরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন, অজ্ঞাত গণকবরে দাফন হয়েছেন, নাকি অফারের মতো ইসরায়েলি বন্দিশিবিরে আটক রয়েছেন। ইসরায়েলের এসব কারাগারে নির্যাতন সাধারণ ঘটনা এবং ফিলিস্তিনিদের অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি রাখা হয়।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর নাঈল নিখোঁজ হন। পরিবারকে সহায়তা করার জন্য কাজের খোঁজে তিনি গাজার মধ্যাঞ্চলের নেতজারিম করিডরের কাছে গিয়েছিলেন। এই এলাকাটি ‘মৃত্যুকূপ’ নামেও পরিচিত। উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে আলাদা করতে ইসরায়েল এই ভূমিখণ্ড দখল ও নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য কার্যত নরকে পরিণত হয়।
নাঈলের বাবা বলেন, ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে পরিবার হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, আমি হাসপাতাল আর মর্গের দরজায় রাত কাটিয়েছি। যখনই কোনো অজ্ঞাত মরদেহ বা শহীদের খবর আসত, আমি দিন-রাত ছুটে যেতাম। আল-আকসা, আল-আওদা ও নুসেইরাত হাসপাতাল ঘুরেছি। নিজ হাতে মর্গের ফ্রিজ খুলে তার কোনো চিহ্ন বা কাপড় খুঁজেছি, কিন্তু কিছুই পাইনি।
পরিবারটি আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়। কোথাও তার আটক থাকার কোনো নথি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরিবারটি বাস্তবতা মেনে নেয়। তারা তাঁবুতে শোকের আয়োজন করে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাকে মৃত হিসেবে ঘোষণা করা সরকারি কাগজ সংগ্রহ করে।
এতসবের মধ্যেও নাঈলের মা আশা ছাড়েননি। তিনি বলেন, সবাই আমাকে গায়েবানা জানাজা পড়তে বলেছিল, কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমার মন বলছিল, ঈদ বেঁচে আছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, এক মাস আগে আশার আলো দেখা যায়। কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত এক বন্দি নাঈল নামে একজনকে দেখার কথা জানান। অবশেষে সোমবার এক আইনজীবী বিষয়টি নিশ্চিত করেন। খবর ছড়িয়ে পড়তেই গাজাজুড়ে আনন্দের ঢেউ ওঠে।
ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও জোরপূর্বক গুমবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক নাদা নাবিল বলেন, আরও বহু পরিবার এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। তিনি বলেন, ঈদ আবু শা’র ঘটনা অনেক বড় একটি চিত্রের অংশ। আমাদের ধারণা, যুদ্ধে বর্তমানে সাত থেকে আট হাজার ফিলিস্তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার মানুষ ইসরায়েলি কারাগারে জোরপূর্বক গুম অবস্থায় আছেন।
নাবিল বলেন, বন্দিদের তথ্য গোপন রাখা কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং এটি ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর যন্ত্রণা দীর্ঘায়িত করার একটি ইচ্ছাকৃত সামরিক কৌশল। গাজার পরিবারগুলোর কষ্ট বাড়াতে দখলদার কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার নীতি অনুসরণ করছে। বন্দিদের তালিকা প্রকাশ করা বা আইসিআরসিকে প্রবেশাধিকার দেওয়া খুবই সহজ কাজ, কিন্তু তারা গোপনীয়তাকেই মানসিক নির্যাতন ও সমষ্টিগত শাস্তির উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, যেসব পরিবার তাদের স্বজনদের দাফন করতে পেরেছে, তারা কোনোভাবে সামনে এগোতে পারে। কিন্তু যাদের কাছে প্রিয়জনের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই, তারা ‘আশা ও হতাশার এক অন্তহীন চক্রে’ আটকে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটির প্রভাব শুধু মানসিক নয়; সামাজিক ও আইনগতও। অনেক স্ত্রী জানেন না, তারা বিধবা নাকি এখনও বিবাহিত। এতে পুনর্বিবাহ ও উত্তরাধিকারের মতো বিষয় জটিল হয়ে পড়ে। তাছাড়া গাজার বাস্তুচ্যুত জীবনে পানি আনা বা তাঁবু খাটানোর জন্যও সবার সাহায্য প্রয়োজন। সেখানে নাঈলের মতো একজন তরুণের অনুপস্থিতি পরিবারের ওপর বিশাল শারীরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
নাবিল গাজায় কার্যরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থতা’র কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আইসিআরসিকে ইসরায়েলি কারাগার পরিদর্শন বা বন্দিদের তালিকা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করছি, যেখানে আইন নয়, শক্তিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মানতে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে বিশ্বব্যাপী ব্যর্থতা গাজার মানুষকে সব ধরনের নির্যাতনের মুখে অসহায় করে দিয়েছে।
নাঈলের মা বলেন, আজ আমি খুব খুশি। কিন্তু এখন আমার হৃদয় আরও বেশি দুশ্চিন্তায় ভরা। এখন যেহেতু জানি সে বেঁচে আছে, তাই ভাবছি ওই সেলে সে কী ভয়াবহ কষ্ট সহ্য করছে। আমি পুরোপুরি খুশি হতে পারব না, যতক্ষণ না আবার তাকে নিজের হাতে জড়িয়ে ধরতে পারছি।