বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ১০:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

কী আছে ইরানের ‘খার্গ’ দ্বীপে, কেনই বা এটি দখলে মরিয়া ট্রাম্প 

ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলে মরিয়া ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলে মরিয়া ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

পারস্য উপসাগরের উত্তপ্ত জলরাশির মাঝে ছোট্ট এক প্রবাল দ্বীপ ‘খার্গ’। আয়তনে মাত্র ২২ বর্গকিলোমিটার হলেও এটিই ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে পৌঁছে।

কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে ইরানিদের কাছে খার্গ দ্বীপ ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামেও পরিচিত। তবে তেলের অবকাঠামোর আড়ালে হাজার বছরের ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং নানা সভ্যতার স্মৃতিও বহন করে চলেছে দ্বীপটি। আল জাজিরার বিশ্লেষণ।

ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু

ইরানের বুশেহর প্রদেশের উপকূল থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপকে দেশটির তেল শিল্পের স্নায়ুকেন্দ্র বলা হয়।

ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আবুজার, ফরুজান ও দুরুদ নামের তিনটি বড় অফশোর তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল এনে এখানে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।

প্রতি বছর প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই টার্মিনালের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। গভীর সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় বিশাল সুপারট্যাঙ্কার সহজেই এখানে ভিড়তে পারে। রপ্তানীকৃত এ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন।

বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখেও ইরান খার্গের অবকাঠামো সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। ২০২৫ সালে দ্বীপটির সংরক্ষণ সক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানো হয়।

ট্রাম্পের হুমকির পর নতুন করে আলোচনায়

খার্গ দ্বীপ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের কারণে।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী দ্বীপটির সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি বলেন, দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়নি।

তিনি সতর্ক করে দেন, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে খার্গের তেল স্থাপনাগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

সাম্রাজ্য, উপনিবেশ ও যুদ্ধের সাক্ষী

তেল আবিষ্কারের বহু আগেই খার্গ দ্বীপ ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি বিভিন্ন শক্তির আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগে প্রথমে পর্তুগিজরা দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে ১৮ শতকে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেখানে দুর্গ নির্মাণ করে। তবে ১৭৬৬ সালে স্থানীয় শাসক মীর মুহান্নার বাহিনী ডাচদের বিতাড়িত করে।

২০ শতকের প্রথমার্ধে ইরানের শাহ রেজা পাহলভি রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসনকেন্দ্র হিসেবে দ্বীপটি ব্যবহার করেন। পরে ১৯৫৮ সালের পর খার্গকে বৃহৎ তেল রপ্তানি কেন্দ্রে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়। ১৯৬০ সালে এখান থেকে প্রথম বড় তেল চালান রপ্তানি করা হয়।

ইতিহাসের নিঃশব্দ ভাণ্ডার

আধুনিক তেল স্থাপনার আড়ালে খার্গ দ্বীপে লুকিয়ে রয়েছে সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। গবেষকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগ থেকেই এখানে মানববসতির অস্তিত্ব ছিল।

দ্বীপটিতে এলামাইট, আকেমেনিড ও সাসানীয় যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। রয়েছে প্রাচীন জরথুস্ত্রী, খ্রিস্টান ও ইসলামি সমাধিক্ষেত্র। এখানকার একটি আকেমেনিড শিলালিপি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে ‘পারস্য উপসাগর’ এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন লিখিত নিদর্শন বলে বিবেচিত।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের ক্ষত

১৯৮০ দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে খার্গ দ্বীপ বারবার বোমা হামলার শিকার হয়। কারণ এটি ছিল ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। যুদ্ধ শেষে দ্বীপটির অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যাপক উদ্যোগ নেয় তেহরান।

বর্তমানে দ্বীপটি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। ফলে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব।

তবু পারস্য উপসাগরের ঢেউয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা খার্গ আজও ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, একই সঙ্গে হাজার বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ইরানি লেখক জালাল আল ই আহমেদ একসময় দ্বীপটিকে ‘পারস্য উপসাগরের এতিম মুক্তা’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বহু যুদ্ধ, সাম্রাজ্য ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও সেই ‘এতিম মুক্তা’ আজও তার গুরুত্ব অটুট রেখেছে।

কালবেলা/এএমএম
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ছাত্রলীগের প্রতি মায়াকান্না দেখানো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব: রাকসু ভিপি

যুক্তরাষ্ট্রের সড়কে ঝরে গেল বাংলাদেশি নবীন ডাক্তারের প্রাণ

কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সোকসাসের স্টুডিওর তালা ভাঙল ডিবেটিং ক্লাব

কাফরুলে যুবদলকর্মী হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল কালীগঞ্জের ৪ যুবক

বৃষ্টি হলেই ডুবে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল, গর্ত-কাদায় চরম ভোগান্তি

শাহজালাল বিমানবন্দরে ৪৩২ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার

দেশে ফেরা প্রসঙ্গে সাকিব / অনেকে ‘ভয় পায়’, এই কারণেই সুযোগটা হচ্ছে না

সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দাবি ইসলামী আন্দোলনের

আসছে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, দেখা যাবে যেসব দেশ থেকে

এনসিপির গাড়িবহরে হামলা, সার্কিট হাউসে আশ্রয় নিয়েছিলেন সারজিস

১০

ভারতে ফোনে কথা বলায় ব্যাঘাত, ৩ বছরের ছেলেকে শ্বাসরোধে হত্যা

১১

১১ দলীয় জোট থেকে লেবার পার্টির বহিষ্কার চান দেওনার পীর

১২

কাপ্তাই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি গ্রেপ্তার

১৩

শাকিবের সঙ্গে রোমান্সে ছিল না কোনো অস্বস্তি, জানালেন সাবিলা নূর

১৪

রাকসু কার্যালয়ে হামলার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন, ৬ দফা দাবি

১৫

ভারতে কারাভোগের পর দেশে ফিরলেন ৫ বাংলাদেশি নারী 

১৬

যমুনা নদীর বাঁধে ফের ভাঙন, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ

১৭

কুলাউড়া পৌর বিএনপির কমিটি স্থগিত

১৮

সারা অ্যাডভারটাইজিংয়ের এমডি আনোয়ার হোসেন মিন্টু আর নেই

১৯

লক্ষ্মীপুরে ১৬ নেতার পদত্যাগের পর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত 

২০
X