

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত ও যুদ্ধবিরতির পর সেই সমীকরণ বদলে গেছে। এখন ইরানের কাছে সবচেয়ে বড় কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরান এখন মনে করছে, পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য অনেক বেশি কার্যকর কৌশলগত অস্ত্র।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ?
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই জলপথে যে কোনো বাধা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের বিশ্বাস, যুদ্ধের সময় প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছিল। তাই এখন তারা এই নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করতে চায়।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন,
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিন। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই একমাত্র পথ।
পারমাণবিক ইস্যু কেন গুরুত্ব হারাল?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ধারণা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয় হয়েছে। অন্তর্বর্তী চুক্তিতেও পারমাণবিক আলোচনাকে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
তেহরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যদি ইরান এখন হরমুজ ইস্যুতে ছাড় দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আরও কঠোর দাবি তুলবে। তাই এই মুহূর্তে কোনো ধরনের নরম অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রবল অবিশ্বাস
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, পরে যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন হামলা চালানো এবং আলোচনার মধ্যেই সামরিক অভিযান শুরু করার ঘটনাগুলো ইরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
এ কারণে তেহরান মনে করছে, শক্ত অবস্থান ধরে রাখাই তাদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
যুদ্ধের পর বদলে গেছে নীতি
এর আগে বহু বছর ধরে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিলেও বাস্তবে তা করতে চাইত না। কারণ এতে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর ইরানের নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশটির নীতিনির্ধারকদের মতে, এখন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই তাদের সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার।
একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ ইরানের জন্য একটি স্বর্ণাস্ত্র। পশ্চিমারা এটি ইরানের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়, কিন্তু তা সম্ভব নয়।
দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী সমঝোতায় বলা হয়েছে, ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করবে।
তবে এই চুক্তির ব্যাখ্যায় দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। ইরানের দাবি, এতে হরমুজ পরিচালনায় তাদের বিশেষ অধিকার পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কথা হলো, চুক্তির অর্থ শুধু নিরাপদ নৌযান চলাচল নিশ্চিত করা; ইরান কোনোভাবেই প্রণালির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরান পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো ধরনের নতুন আলোচনা শুরু করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বড় বিরোধের কারণ হতে পারে হরমুজ
বর্তমানে পারমাণবিক কর্মসূচি আপাতত আলোচনার বিষয় হলেও ভবিষ্যতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিরোধের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন,
দুই পক্ষই মনে করছে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। ফলে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে উভয়েই আরও চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিতে পারে।