

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ ক্রমেই আরও অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একসময় যেসব সিদ্ধান্ত পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত মনে হচ্ছিল, সেগুলোর জায়গা এখন দখল করছে হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং বিতর্কিত মন্তব্য। এর ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ বাড়ছে। তার ক্রমবর্ধমান এ অস্থিরতা বিশ্বব্যবস্থাকেও ঝুঁকি ফেলছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে কিছু নিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড লক্ষ করা গেছিল। সুস্পষ্টভাবে প্রস্তুত করা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিনি ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক কাঠামো ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অগ্রাধিকার বদলে দিতে শুরু করেন। ইউএসএআইডি বন্ধ করা, ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বড় ধরনের ছাঁটাই, এমনকি আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে হস্তক্ষেপ—সবই ছিল তার আগের মেয়াদের পর চার বছরের বিরতির সময় তৈরি করা একটি রাজনৈতিক রূপরেখার অংশ।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিকল্পিত ধারা ভেঙে পড়েছে। এখন ট্রাম্পকে অনেক বেশি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসে তার মেজাজ দিন দিন আরও খিটখিটে হয়ে উঠছে, যদিও ফ্লোরিডায় সপ্তাহান্ত কাটানোর সময় তাকে তুলনামূলক হাসিখুশি দেখা যায়। এ দ্বৈত আচরণ প্রশাসনের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এদিকে ২০২০ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ঘিরে ট্রাম্পের পুরোনো দাবি আবার সামনে এসেছে। জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ডকে জর্জিয়ায় পাঠানো হয়েছে কথিত প্রমাণ খুঁজতে। এমনকি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়েও ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, যা নির্বাচন ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
অভিবাসন ইস্যুতেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টদের অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর জনমত ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে চলে যায়। এরপর হঠাৎ করেই প্রেসিডেন্ট ‘নরম আচরণে’র কথা বলেন। যদিও সমালোচকদের মতে, এটি আসলে কঠোর অভিযানের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর একটি কৌশল মাত্র।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, তিনি ওয়াশিংটনের ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও নিউইয়র্কের পেন স্টেশন নিজের নামে নামকরণ করতে চান। এসব উদ্যোগ অনেকের কাছেই আত্মকেন্দ্রিক ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে মনে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ট্রাম্পের বক্তব্য অস্থিরতা তৈরি করেছে। ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড ‘হস্তান্তর’ করার দাবি ন্যাটো জোটের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং নিজ দলের রিপাবলিকানদের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত তাকে পিছু হটতে হয়।
দেশের ভেতরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৬ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন প্রেসিডেন্ট সঠিক বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন। আরও উদ্বেগজনক হলো, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নাগরিক বিশ্বাস করেন যে ট্রাম্প সাধারণ মানুষের কথা ভাবেন।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ও ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে ফারাক দেখা যাচ্ছে। তিনি দাবি করছেন অর্থনীতি শক্তিশালী, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জন্য এখনও বড় চাপ হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংঘাত আসন্ন হচ্ছে অভিবাসন ও আইসিই নিয়ে। ডেমোক্র্যাটরা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের বাজেট আটকে দিয়ে আইসিইর ক্ষমতা সীমিত করতে চাইছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের কঠোর নীতির পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে।