

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে ইরান নতুন একটি শর্ত যুক্ত করেছে, যা আগে তাদের দাবির তালিকায় ছিল না। নতুন এ শর্ত হলো—হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দেওয়া। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথকে তেহরান এখন শুধু সামরিক চাপের হাতিয়ার নয়, বরং অর্থ উপার্জনের বড় উৎস হিসেবেও ব্যবহার করতে চায়।
হরমুজ প্রণালি একটি সরু জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান বহুদিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছিল যে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দেবে। তবে অনেকে মনে করতেন, বাস্তবে এটি করা কঠিন হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ইরান এই পথের চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এর প্রভাব বিশ্ববাজারে ব্যাপকভাবে পড়েছে।
জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক দেশ জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতি ইরানকে নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করেছে। এখন তারা বুঝতে পেরেছে, তুলনামূলক কম খরচে এবং সহজ উপায়ে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন এই কৌশলকে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধায় রূপ দিতে চাইছে। তারা শুধু প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়ে থেমে থাকতে চায় না, বরং এটি থেকে নিয়মিত আয় করার পথ খুঁজছে। এ জন্য তারা প্রণালি ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছ থেকে টোল বা ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের টোল ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে, বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বের সব দেশের জন্য বাধাহীন ও বিনামূল্যে নৌ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে বিষয়টি জটিল। হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে সব দেশের জাহাজের অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। এই নিয়ম জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশন অনুযায়ী নির্ধারিত। যদিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির সদস্য নয়, তবুও এর অনেক নীতিমালা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
ইতিহাসে খুব কম উদাহরণ রয়েছে যেখানে কোনো দেশ আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য সফলভাবে টোল আদায় করতে পেরেছে। এক সময় ডেনমার্ক এমন চেষ্টা করেছিল; কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
তবু ইরান এই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। যদি তারা সফলভাবে এই ব্যবস্থা চালু করতে পারে, তাহলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় সম্ভব। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়। যদি প্রতি ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার করে নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ডলার আয় হতে পারে। মাসে এটি প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। গ্যাস পরিবহন যুক্ত হলে এই আয় আরও বেড়ে ৮০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তুলনার জন্য বলা যায়, মিশরের সুয়েজ খাল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়। ফলে ইরানের পরিকল্পনা সফল হলে তা সুয়েজ খালের আয়ের সমান বা কাছাকাছি হতে পারে।
ইরানের এই পদক্ষেপের পেছনে অর্থনৈতিক চাপও বড় কারণ। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি বৈশ্বিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে ইরান এখন হরমুজ প্রণালিকে একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত করেছে। এটি একদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য বড় আয়ের উৎস হিসেবেও উঠে আসছে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয় এবং এতে আন্তর্জাতিক বিরোধ আরও বাড়াতে পারে।