বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বোমায় কাজ করেনি, অবরোধে কি ভেঙে যাবে ইরান

মিডল ইস্ট মনিটরের নিবন্ধ
বোমায় কাজ করেনি, অবরোধে কি ভেঙে যাবে ইরান

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার জন্য চলমান আলোচনার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের শাসনবব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তারা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকে মার্কিন জোটের হামলার ১৮ গুণ বেশি হামলা চালায় এবারের ইরানে। ১৩ হাজার বেসামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েও সামান্য কিছু অস্থায়ী কৌশলগত অর্জন করতে পেরেছে।

তবে তাদের বিমান হামলা সরকার পরিবর্তনের মতো স্থায়ী কৌশলগত সাফল্য করতে পারেনি। এর পরিবর্তে গোটা সভ্যতা ধ্বংস করে ও তেল সম্পদ দখল করে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠানোর হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো এখনো পূরণ হয়নি। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ওয়াশিংটন ও মোজতবা খামেনির তেহরান ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পাশাপাশি পাকিস্তানে তারা প্রথম দফার বৈঠক করে। তবে উভয়পক্ষই নিজেদের কঠোর অবস্থানে অটল থাকায় কোনো চুক্তি ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এরপর দ্বিতীয় দফার আলোচনার উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

এ পরিস্থিতিকে মার্কিন অধ্যাপক ও বিশ্লেষক উইলিয়াম জার্টম্যান বলেছেন— ‘পারস্পারিকভাবে ক্ষতিসাধনকারী অচলাবস্থা’ মানে এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে দুই পক্ষই বুঝতে পারছে যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ সম্ভাব্য লাভের চেয়েও বেশি। শেষপর্যন্ত সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। তবে আলোচনার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।

ক্ষয়যুদ্ধের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো অবরোধ। ওই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর গত সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সব সমুদ্রবন্দরগামী ও বহির্গামী জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে অবরোধ করবে। অবরোধ হলো যুদ্ধকালীন একটি নৌ-ব্যবস্থা, যা সামরিক শক্তি দিয়ে একটি দেশের বাণিজ্য ও পণ্য প্রবাহ বন্ধ করে দেয় এবং আন্তর্জাতিক আইনে এটিকে যুদ্ধের কাজ হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা হলো সামরিক সংঘাত ছাড়া অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি পদ্ধতি। তবে ইরাক, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার উদাহরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কখনো কখনো নিষেধাজ্ঞা অবরোধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো—ইরানে চালানো বিমান হামলায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫৩ জন নিহত হওয়ার পরও যদি সরকার পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে কি অবরোধ সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে?

ট্রাম্প প্রশাসন এ অবরোধকে চাপ হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়—যা ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার আগে স্বাভাবিকভাবে খোলা ছিল। তবে এ কৌশলের মধ্যে সময় ও পরিধি নিয়ে কিছু বিরোধ রয়েছে। সময়ের দিক থেকে অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে। যুদ্ধ এরই মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারকে অস্থির করেছে। এ পরিস্থিতি কিছুটা ইরানের পক্ষেই যায়, কারণ বৈশ্বিক ক্ষতি বাড়লে ক্ষয়যুদ্ধ তাদের টিকে থাকার কৌশল হয়ে ওঠে।

অবরোধের ব্যাপ্তিও ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের সব উপকূলীয় বন্দর ও তেল টার্মিনালকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সব দেশের জাহাজের ওপর প্রয়োগ করলে চীনসহ বড় শক্তির সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এতে মার্কিন জাহাজগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

তবুও, এ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, দেশটি আগে থেকেই দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ক্ষতিতে দুর্বল। তেল রপ্তানি বন্ধ হলে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল এখনো সমুদ্রে রয়েছে, যা বড় অর্থনৈতিক উৎস হতে পারে। তবে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এ অর্থ পুনর্গঠনের বদলে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের টোল ব্যবস্থার দিকে নজর দিয়েছে। ধারণা করা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে প্রতি ব্যারেলে ১ ডলার করে নিয়ে ইরান বছরে ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে, যা তারা অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে চায়।

অনেক বিশ্লেষণে ইরানের অবকাঠামোর ওপর নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ইরাকের উদাহরণ দেখলে স্পষ্ট হয় যে, অবকাঠামো ধ্বংস করে দেশকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব।

ট্রাম্পের দাবি যে ইরান কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে, তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলাকে ইঙ্গিত করে। তবে এতে সরকার পরিবর্তন হয়নি; বরং সাধারণ মানুষই বেশি কষ্ট পাচ্ছে। এ অবরোধ সম্ভবত হরমুজ প্রণালি ফের খুলতে পারবে না, সরকার পরিবর্তন তো দূরের কথা। বরং এটি একটি সুসংগঠিত কৌশলের চেয়ে দ্রুত নেওয়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে।

এ ছাড়া, এ অবরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সমর্থনও নেই। কিউবা ও ভেনেজুয়েলার উদাহরণের স্পষ্ট হয় যে, এ কৌশল সবসময় কার্যকর হয় না। কিউবা দীর্ঘদিন অবরোধে থেকেও টিকে আছে, আর ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বদলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা বেশি দেখা গেছে। আর ইরান, যার আঞ্চলিক প্রভাব বেশি, জ্বালানির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সক্ষমতা শক্তিশালী—তাকে অবরোধের মাধ্যমে নতি স্বীকার করানো আরও কঠিন হবে।

কালবেলা/পিআর
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক মণ দুধ দিয়ে গোসল করে মাদক ব্যবসা ছাড়ার ঘোষণা

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গুলি

জামায়াত ফেরেশতাদের দল নয়, আমরাও মানুষ: ডা. শফিকুর রহমান

দেশের প্রথম মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘বৈদেশ’

সাংহাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিলেন আব্বাস আরাঘচি

জলাবদ্ধতায় পরীক্ষা: কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ৭ শিক্ষক বদলি

পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচিত হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি: স্পিকার

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর পাল্টা হামলা, নিহত ১

ইয়ামালের বাবা হওয়া নিয়ে প্রচারিত ছবিটি এআই জেনারেটেড: রিউমর স্ক্যানার

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ লক্ষ্মীপুর জেলার কমিটি ঘোষণা

১০

গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বেটিং সন্দেহ, তদন্তের মুখে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা

১১

মারা গেলেন দুবারের সাবেক মেয়র

১২

এক ইলিশ ৬ হাজার ৮২৫ টাকায় বিক্রি

১৩

কমছে সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি 

১৪

সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরলেন স্পিকার

১৫

সবজির বাজারে আগুন, ক্রেতাদের নাভিশ্বাস

১৬

এবার ভারতজুড়ে বিক্ষোভের ডাক ককরোচ পার্টির

১৭

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে সরকার: মির্জা ফখরুল

১৮

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জামায়াত নেতার পদত্যাগ

১৯

বোয়েসেলের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন রাশেদুল হক

২০
X