বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন ঘাঁটির জন্যই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত মিত্ররা এখন কী করবে

ইরানের হামলা
মার্কিন ঘাঁটির জন্যই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত মিত্ররা এখন কী করবে

মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো একটি কঠিন সত্য প্রকাশ্যে বলতে চায় না যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি নিজেদের দেশে স্থাপন করতে দিলে শুধু নিরাপত্তাই পাওয়া যায় না, সেই সঙ্গে নিজের ভূখণ্ডও বড় শক্তির যুদ্ধের অংশ হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বন্দর, বিমান ঘাঁটি ও ছোট ছোট দেশ এমন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যে যুদ্ধ তারা নিজেরা শুরু করেনি এবং সহজে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না।

ইরানের ওপর মার্কিন হামলার পর তেহরান বাহরাইন ও কুয়েতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পর এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন কথা বলবে। কেউ বলবে, বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করা হয়েছে, কেউ বলবে সামরিক প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করবে, তাদের সামরিক উপস্থিতি অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়, তখন তার প্রতিক্রিয়া শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তির মতো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, অস্ত্র বিক্রি, প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, এই ব্যবস্থার একটি নেতিবাচক দিকও আছে। বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর রয়েছে। কুয়েতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। সেখানে ক্যাম্প আরিফজান ও আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র। শান্তিকালে এসব ঘাঁটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে এগুলোই শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

এ কথা বলা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, বরং বাস্তবতা স্বীকার করা। একটি বিদেশি সামরিক ঘাঁটি কখনোই পুরোপুরি ঢাল হতে পারে না, যদি সেটি সেই দেশকে হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য বানিয়ে দেয়। বিদেশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কিছু হুমকি কমাতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই শক্তির শত্রুদেরও নিজের দেশে টেনে আনে। বাহরাইন ও কুয়েত এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি। তাদের আকাশ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষ এখন ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করছে।

প্রায়ই বলা হয়, এই অঞ্চলে একটি ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো’ তৈরি হয়েছে। কথাটি শুনতে সুন্দর মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ ভিন্ন হতে পারে। এতে ছোট দেশগুলো বড় শক্তির সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে এবং এটিকে স্থিতিশীলতার ব্যবস্থা বলে তুলে ধরে। কিন্তু যদি এই ব্যবস্থাই ইরানের পাল্টা হামলা ঠেকাতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—আসলে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে? সাধারণ মানুষের, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের?

এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাহরাইন ও কুয়েত শুধু সামরিক মানচিত্রের কয়েকটি বিন্দু নয়। সেখানে লাখো মানুষ বসবাস করে। বিমানবন্দর, বন্দর ও সামরিক ঘাঁটির আশপাশে বহু পরিবার থাকে। সংকটের সময় সাধারণ সড়কও সামরিক চলাচলের পথে পরিণত হয়। স্থানীয় মানুষ, প্রবাসী শ্রমিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন না, কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সম্প্রতি কুয়েতে কর্মরত অনেক বেসামরিক ঠিকাদারও ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই ভয়কে অবহেলা করা উচিত নয়।

অনেকে বলবেন, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়েছে। এতে কিছুটা সত্য রয়েছে। এসব দেশের সরকার বহু বছর ধরে মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু সরকারের সম্মতি মানেই দেশের সব মানুষের জন্য এই ব্যবস্থা নিরাপদ—এমন নয়। কোনো নীতির কারণে সাধারণ মানুষের ঝুঁকি বাড়লে সেটিও বিবেচনা করা দরকার।

সমস্যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক নয়। মূল সমস্যা হলো, সেই সম্পর্ক কখনো কখনো বাহরাইন ও কুয়েতকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অংশে পরিণত করে। ইরানের বার্তাও মোটামুটি স্পষ্ট—যদি এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে জবাবও এই অঞ্চলের মধ্যেই আসতে পারে। এতে যুদ্ধ সমর্থন করা হয় না, বরং বোঝানো হয় যে, এমন প্রতিক্রিয়া অনুমান করা কঠিন নয়।

এখানে একটি নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলে, তাদের উপস্থিতি এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা কমায়। কিন্তু বাস্তবে ইরানের সঙ্গে তাদের সংঘাত বহুবার উপসাগরীয় দেশগুলোর সীমান্ত, সমুদ্রপথ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। সেখানে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারেও প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর তেলের দাম বেড়েছে এবং জাহাজ চলাচলও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ফলে যেসব যুদ্ধকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলা হয়, সেগুলো অনেক সময় এই দেশগুলোর নিরাপত্তাই কমিয়ে দেয়।

এখন বাহরাইন, কুয়েত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের উচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রাখা কি সত্যিই তাদের নিরাপত্তা বাড়ায়, নাকি শুধু তাদের ওয়াশিংটনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে তেহরানের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খোলামেলা আলোচনায় টিকতে পারে না, সেটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নয়, বরং নির্ভরশীলতা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণেরও ভাবা উচিত, বিদেশে তাদের সামরিক ঘাঁটির কারণে সেই দেশগুলোর সাধারণ মানুষ কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। মানচিত্রে একটি সামরিক ঘাঁটি কেবল একটি বিন্দু মনে হলেও বাস্তবে তার চারপাশে মানুষের বসতি, রাস্তা, বন্দর ও কর্মস্থল থাকে। যুদ্ধ শুরু হলে সেই মানুষগুলোর জীবনও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

তাই ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের স্বার্থ নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোরও স্বার্থ। বাহরাইন ও কুয়েতের জনগণকে অন্যের যুদ্ধের প্রথম আঘাত সহ্য করতে বাধ্য করা উচিত নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই তার মিত্রদের মূল্য দেয়, তাহলে তাদের ভূখণ্ড এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে পাল্টা হামলার ঝুঁকি আগেই অনুমান করা যায়।

এই অঞ্চলে আরও বেশি বিদেশি অস্ত্র বা সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে দরকার নতুন রাজনৈতিক চিন্তা। দরকার উত্তেজনা কমানো, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপ বাড়ানো এবং এমন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে বিদেশি সেনাঘাঁটির ওপর নির্ভরতা কমে। কারণ শান্তির সময় একটি বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নিরাপত্তার প্রতীক মনে হতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের সময় সেটিই হামলার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু সামরিক শক্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতাই বেশি কার্যকর হতে পারে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুদ্ধজাহাজ থেকে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া 

ড. ইউনূসসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

পিএনএস হ্যাঙ্গর / পাকিস্তানের প্রথম উন্নত স্টেলথ সাবমেরিন, এর বিশেষত্ব কী

ব্রাজিল বিদায় নেবে, ভবিষ্যদ্বাণী করলেন ক্রিস সাটন

ইরানের ‘বিকল্প অস্ত্র’ বাব আল-মান্দেব প্রণালি: মেদভেদেভ 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা ভেস্তে দিতে চায় ইসরায়েল: এরদোয়ান

হাউজিংয়ের এমডিকে মারধর করে চেক ও স্ট্যাম্পে সই, ভিডিও ভাইরাল

পুরান ঢাকায় নকল রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসের কারবার, ১৩ সিলিন্ডার জব্দ

গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র হলেন আবু হানিফ 

প্রাণহানি ৩ হাজার  / এখনো নিখোঁজ বহু মানুষ, উদ্ধার অভিযানের ইতি টানছে ভেনেজুয়েলা

১০

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়োগ / অষ্টম শ্রেণি পাসে এসএসএফে চাকরির সুযোগ, আজই শেষ দিন

১১

খালে বস্তা দেখে ‘লাশ’ আতঙ্ক, খুলে মিলল মৃত কুকুর

১২

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতার ইয়াবা সেবনের ভিডিও ভাইরাল

১৩

সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ

১৪

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে ৭৩১ জনের বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

১৫

আজ বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন আমির খান

১৬

মালয়েশিয়ায় ১০৫ প্রবাসী শ্রমিককে সহায়তায় হাইকমিশনকে আইনি নোটিশ

১৭

মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা একাদশে যে ৩ পরিবর্তনের আভাস

১৮

বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের জন্য জরুরি নির্দেশনা

১৯

ফতুল্লায় অভিযানের নামে সোনা চুরির অভিযোগ, বরখাস্ত দুই পুলিশসহ কারাগারে ৪

২০
X