

রাজধানীর পুরান ঢাকায় নকল রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস বাজারজাতের অভিযোগে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ওয়ারী থানা পুলিশ এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে এবং জব্দ করেছে ১৩টি সন্দেহভাজন রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসের সিলিন্ডার।
তদন্তকারীদের ধারণা, এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। বিষয়টির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ২৯ জুন বিক্রমপুর মার্কেটের আনিকা রেফ্রিজারেশন থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ১৩টি সন্দেহভাজন রেফ্রিজারেন্ট সিলিন্ডার জব্দ করেন। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুযায়ী A2L (মৃদু দাহ্য) শ্রেণিভুক্ত R32 রেফ্রিজারেন্টের সিলিন্ডারের লেবেল, রং ও পরিচিতি পরিবর্তন করে তা A1 (অদাহ্য) শ্রেণিভুক্ত R410A নামে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছিল।
পরে বাংলাদেশ রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ব্রামা) উদ্যোগে উদ্ধার হওয়া সিলিন্ডারগুলো ঢাকা রেফ্রিজারেশন সমবায় সমিতির সহযোগিতায় ওয়ারী থানায় হস্তান্তর করা হয়। জনস্বার্থ ও ভোক্তা নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্রামার পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটককৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে আরও কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরবরাহকারী চক্র জড়িত রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া সিলিন্ডারগুলোর প্রকৃত রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, R32 এবং R410A কখনোই একই রেফ্রিজারেন্ট নয়। R32 একটি মৃদু দাহ্য (A2L) রেফ্রিজারেন্ট, অন্যদিকে R410A অদাহ্য (A1) শ্রেণিভুক্ত। ফলে এই দুই ধরনের গ্যাসের নিরাপত্তা নির্দেশিকা, ব্যবহার পদ্ধতি এবং যন্ত্রের নকশাগত চাহিদা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, যদি R410A হিসেবে চিহ্নিত কোনো সিলিন্ডারে প্রকৃতপক্ষে R32 থাকে, তবে ব্যবহারকারী বা সার্ভিসিং প্রযুক্তিবিদ তা না জেনেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। এতে গ্যাস লিক হলে অগ্নিকাণ্ড, দাহজনিত দুর্ঘটনা, যন্ত্রপাতির ক্ষতি, কম্প্রেসর নষ্ট হওয়া এবং গুরুতর আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রেফ্রিজারেন্টের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে বাজারজাত করা শুধু ভোক্তা প্রতারণাই নয়, জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্রামার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এয়ার কন্ডিশনিং ও রেফ্রিজারেশন-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে ভুল লেবেলযুক্ত বা নিম্নমানের রেফ্রিজারেন্টের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা জরুরি।
ব্রামার সভাপতি বলেন, রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসের নামে কোনো ধরনের প্রতারণা, লেবেল জালিয়াতি কিংবা ভেজাল ব্যবসা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা চক্র—যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভোক্তার জীবন, সম্পদ এবং দেশের রেফ্রিজারেশন শিল্পের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসের বাজারে নিয়মিত অভিযান, মান নিয়ন্ত্রণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং আমদানি থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ওয়ারী থানা পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া সিলিন্ডারগুলোর রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা, জব্দকৃত আলামত বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এটি কেবল একটি ভোক্তা প্রতারণার ঘটনা নয়; বরং জননিরাপত্তা, শিল্প খাতের সুশাসন এবং বাজারে মানসম্মত রেফ্রিজারেন্ট সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।