

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর বিমান হামলার তীব্রতা বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে বিপজ্জনক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের এই অতি সামরিকীকরণ কৌশল তেহরানকে আলোচনার টেবিলে কতটা বাধ্য করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে। সাড়ে চার মাসের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বিশ্লেষকরা বলছেন, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের কাছ থেকে একতরফা রাজনৈতিক বা কৌশলগত ছাড় আদায়ের যে নীতি অতীতে ব্যর্থ হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছেন।
মাত্র এক মাস আগে সই হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফলে একদিকে যেমন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বৈশ্বিক তেল বাজার ও অর্থনীতির চাপ বাড়ছে। দুই পক্ষ এখনো সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে চললেও সংকট থেকে কূটনৈতিক উপায়ে বের হওয়ার পথ দিন দিন আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে।
চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা ষষ্ঠ দিনের মতো দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র হামলা-পাল্টা হামলা চলেছে। তবে এবারের সংঘাত কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে এর জবাবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সংকেত দিয়ে রেখেছে তেহরান।
ভূরাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে ট্রাম্প এখন ইরানের জ্বালানি কেন্দ্র, সংযোগ সেতু এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে বোমাবর্ষণের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন। এমনকি স্থলসেনা পাঠিয়ে ইরানের প্রধান তেল হাব খার্গ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনাও মার্কিন টেবিলে রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের জোগান পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সাড়ে চার মাসের এই ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন এবং তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বড় ক্ষতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরানের নীতিনির্ধারকদের অবস্থান পরিবর্তন করা যায়নি। আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ এই সামরিক কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, এই নতুন সেট বা ট্রাম্পের মাথায় থাকা যে কোনো নতুন হামলার পরিকল্পনা ইরানিদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে বলে বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। বরং এটি তেহরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কট্টর ও জেদি করে তুলবে।
যদিও হোয়াইট হাউসের দাবি, তারা কূটনীতির পথ খোলা রাখতে চায়, তবে ইরান শুধু সামরিক শক্তির ভাষা বোঝে বলেই তারা মনে করছে। সে কারণেই হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটন তার ভাষায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে নতুন করে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির বিশেষ ছাড়পত্র বাতিল করেছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পেছনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই যুদ্ধের ফলে এরই মধ্যে ইরান ও লেবাননের হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক স্তরে ওয়াশিংটনকে নৈতিক সংকটে ফেলেছে। পাশাপাশি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেও অর্থনৈতিক মন্দার চাপ বাড়ছে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিংয়ে বড় ধস নামিয়েছে।
ইসরায়েলের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, মার্কিন প্রশাসন যতই চাপ তৈরি করুক, ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ করবে না। ট্রাম্প যদি হামলার পরিধি বাড়াতে থাকেন, তবে তেহরানের পক্ষ থেকেও সমানুপাতিক পাল্টা আঘাতের শঙ্কা তৈরি হবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়ে মারবে।