কালবেলা প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:১৫ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:২০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

হত্যার পর জাহাজটি নদীতে নেওয়া হয়, ধারণা পুলিশের

এমভি আল-বাখেরায় সাত খুন
হত্যার পর জাহাজটি নদীতে নেওয়া হয়, ধারণা পুলিশের

চট্টগ্রাম ব্যুরো ও চাঁদপুর প্রতিনিধি

চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে নোঙর করা সারবোঝাই ‘এমভি আল-বাখেরা’ জাহাজ থেকে সাত কর্মীর লাশ উদ্ধার হলেও পুলিশের তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, নির্জন সমুদ্রে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। সার লুটের জন্য জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে। সাত খুনে অন্তত ৯ জন অংশ নিয়েছিল। দুর্বৃত্তরা জাহাজটির কর্মীদের কারও পরিচিতও হতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য মিলেছে।

সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে এমভি আল-বাখেরা জাহাজের পাইলট মো. নিঃস্বার্থ ঘটনার সময় জাহাজে ছিলেন না। কেন ছিলেন না, সেই তথ্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। এ ছাড়া আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ওই জাহাজের কর্মী জুয়েল রানাকে ঘিরেও সন্দেহ রয়েছে।

এমভি আল-বাখেরা জাহাজটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর কাফকো জেটি থেকে ৭২০ টন ইউরিয়া সার বোঝাই করে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ডিপোতে যাচ্ছিল। গত রোববার রাত ৮টার দিকে জাহাজের মালিক কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সোমবার সকাল থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। এরপর একই মালিকের অন্য একটি জাহাজ দিয়ে অনুসন্ধানের পর মেঘনার হাইমচরে নোঙর করা অবস্থায় পাওয়া যায় এমভি আল-বাখেরা জাহাজটি। ভেতরে ঢুকে অন্য জাহাজের কর্মীরা দেখতে পান, আটটি কক্ষে রক্তাক্ত অবস্থায় আটজনের দেহ পড়ে আছে। খবর পেয়ে পুলিশ জাহাজ থেকে পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। রক্তাক্ত অবস্থায় অন্য তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালে আরও দুজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গলার প্রায় অর্ধেকটা কাটা জাহাজকর্মী জুয়েল রানার চিকিৎসা চলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গতকাল মঙ্গলবার চাঁদপুর সদর হাসপাতাল থেকে সাতজনের মরদেহ স্বজনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

নৌ-পুলিশের চাঁদপুর অঞ্চলের সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান গতকাল কালবেলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা জানতে পেরেছেন, জাহাজটি যেখানে নোঙর করা ছিল, সেটি সেখানে থাকার কথা নয়। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসার পর সমুদ্রের কোনো নির্জন এলাকায় দুর্বৃত্তরা জাহাজটিতে উঠে নিয়ন্ত্রণে নেয়। হয়তো ওই দুর্বৃত্তদের জাহাজকর্মীরা চিনে ফেলায় তাদের খুন করা হয়।

তিনি বলেন, সার্বিক বিষয় যাচাই করে এখন পর্যন্ত মনে হয়েছে, সার লুট করতেই গভীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কারণ যেখানে জাহাজটি নোঙর করা হয়েছে, সেখান থেকে সাত থেকে ৮শ টন সার দ্রুত সরানো সম্ভব নয়। এত সার লুট করতে গভীর পরিকল্পনা দরকার। হয়তো জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্য কোথায় তা খালাস করা হতো। কিন্তু কোনো কারণে দুর্বৃত্তরা হাইমচরে জাহাজ রেখে পালিয়ে গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, এমভি আল-বাখেরা জাহাজের কর্মীদের কারও সহায়তা ছাড়া সেখানে বাইরে থেকে ওঠা সম্ভব নয়। হয়তো জাহাজ থেকেই দুর্বৃত্তদের এই সহায়তা করা হয়েছে। তা ছাড়া জাহাজের পাইলট সেদিন জাহাজে ছিলেন না। এসব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চলছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, চিকিৎসাধীন কর্মী জুয়েল রানার গলা কাটা থাকায় কথা বলতে পারছেন না। তিনি লিখে কিছু তথ্য দিয়েছেন। সে অনুযায়ী জাহাজে আট থেকে ৯ জন দুর্বৃত্ত উঠেছিল। সবার কাছেই ধারালো অস্ত্র ছিল।

‘ঘুমন্ত অবস্থায়’ হত্যা করা হয় সাত কর্মীকে: তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাতজনের লাশই মিলেছে পৃথক পৃথক কক্ষে। তাদের প্রায় সবার শরীরে কম্বল ও চাদর ছিল এবং তারা শোয়া অবস্থায় ছিলেন। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রত্যেককে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। জাহাজটি নিয়ন্ত্রণের আগে দুর্বৃত্তরা কর্মীদের ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে কাজ চলছে।

নৌ-পুলিশের চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, জাহাজে ডাকাতি করতে গেলে সবাইকে হত্যা করার কথা নয়। আর ডাকাতি করতে গেলে কর্মীদের ন্যূনতম প্রতিরোধ করার কথা। সে আলামত মেলেনি। প্রত্যেকের মরদেহ নিজ নিজ কক্ষে মিলেছে। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের প্রত্যেককে হত্যা করা হয়। অবশ্য হত্যার আগে তাদের অবশ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

চার মোবাইল ফোন ও এক চায়নিজ কুড়াল ঘিরে চলছে তদন্ত: নৌ পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে চারটি মোবাইল ফোন, একটি চায়নিজ কুড়াল ও একটি ছুরি জব্দ করা হয়েছে। এগুলো ধরে প্রযুক্তিগত তদন্ত চলছে এবং বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডি ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

নৌ শ্রমিকদের বিক্ষোভ: এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জন্য সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন নৌযান শ্রমিকরা। এ সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা না হলে ২৬ ডিসেম্বর রাত ১২টার পর থেকে সারা দেশের নৌপথ বন্ধ ঘোষণা করা বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সদস্য ও ঢাকা-চাঁদপুর লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশিদ। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চাঁদপুরের নৌযান শ্রমিকরা লঞ্চঘাট এলাকায় বিক্ষোভ করেন।

নেপথ্যে চাঁদাবাজির আশঙ্কা: ওই জাহাজের ইঞ্জিনচালক নড়াইলের লোহাগড়ার নিহত সালাউদ্দিন মোল্লার (৪০) চাচাতো ভাই ও আরেক জাহাজের মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটা কোনো ডাকাতি ছিল না। কারণ দুর্বৃত্তরা হত্যার পর কোনো কিছু নেয়নি। এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। চাঁদপুরের এই নৌরুটে ব্যাপক চাঁদাবাজি চলে। বিশেষ করে যেখানে এই ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হয়। চাঁদা না দিলে মারধর করা হয়। বিষয়টি প্রশাসনও জানে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এজন্য নিরুপায় হয়ে সবাই চাঁদা দিয়ে থাকেন। হয়তো সেই চাঁদাবাজরাই এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।

এদিকে ঘটনাস্থল ঘুরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌযান পরিবহন চাঁদপুরের নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক শ আ মাহফুজ উল আলম মোল্লা বলেন, জাহাজটির আকার অনুযায়ী কমপক্ষে ১২ জনের লোকবল থাকার কথা। কিন্তু কেন নেই, তা জানতে আমরা কাগজপত্র চেয়েছি। জাহাজটিতে পাইলটও ছিল না। যার কারণে নির্দিষ্ট কেনেলের বাইরে গিয়ে জাহাজটি চালানো হচ্ছিল।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ওয়ালটনের পিসিবিএ রপ্তানি শিপমেন্ট উদ্বোধন

স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো অবহেলা বরদাশত করবে না সরকার : প্রতিমন্ত্রী

‘তুই মরে যা, আমার কিছু যায় আসে না’, ইকরাকে বলতেন আলভী

জয়পুরহাটে শিশু ধর্ষণের দায়ে কৃষকের যাবজ্জীবন

ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন মোতাহার হোসেন

সরকারি কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করল আফগানিস্তান 

হাইতির বিপক্ষে নামার আগে সুখবর পেল ব্রাজিল

বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় হল সংসদ নেতাকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ রাকসু জিএস আম্মারের বিরুদ্ধে

রাত ১টার মধ্যে ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টি হতে পারে যেসব অঞ্চলে

ঋণখেলাপি ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ, সরকারি ও বিরোধী দলের তুমুল বিতর্ক

১০

বিএনপি নেতা রোকনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ

১১

খুবি ছাত্রীকে অধ্যাপকের কুপ্রস্তাব, প্রতিবাদে কুশপুত্তলিকা দাহ ও জুতা নিক্ষেপ

১২

খালার বাড়ি থেকে ফেরার পথে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রী

১৩

ট্রেলারেই রহস্যের ঝড়, ২৫ জুন আসছে ‘হেডলাইন’

১৪

স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ, থানায় আত্মসমর্পণ স্বামীর

১৫

চাঁদপুর ট্রিবিউনের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

১৬

বিশ্বকাপে মিলে গেল মেসির ভবিষ্যদ্বাণী

১৭

এইচপিভি টিকা নেওয়া তরুণীদের জরায়ুমুখ ক্যানসারে মৃত্যু প্রায় শূন্য

১৮

দেশজুড়ে বৃষ্টির দাপট থাকবে আরও ৫ দিন, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আভাস

১৯

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে ট্রাম্পের সমর্থন চাইলেন জেলেনস্কি  

২০
X