

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনা অভিযানে আটকের পর বিএনপি নেতার মৃত্যুর ঘটনায় সেখানকার ক্যাম্প কমান্ডারসহ সব সেনাসদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনাবাহিনীর অভিযানে আটকের পর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুর (৫২) মৃত্যু হয়। অমানুষিক নির্যাতনের কারণে ডাবলুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এ ঘটনায় সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব এ ঘটনার নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।
ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে আইএসপিআর। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, এরই মধ্যে সেই ক্যাম্পের কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনাসদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার এবং সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আইএসপিআর আরও জানিয়েছে, গত ১২ জানুয়ারি রাত ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে যৌথ বাহিনী একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন একটি ফার্মেসি দোকান থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মো. শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুকে আটক করা হয়। পরবর্তী সময়ে আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টহল দল ওই ফার্মেসিতে তল্লাশি করে একটি ৯ মিমি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। অভিযান শেষে আটক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আনুমানিক রাত ১২টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাফিজা ফার্মেসির সামনে থেকে ডাবলুকে আটক করে বিএনপির কার্যলয়ের এক কক্ষে নেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
চুয়াডাঙ্গা আর্মি ক্যাম্প অধিনায়ক লে. কর্নেল ফাহাদ হোসাইন বলেছেন, ‘জেলায় নিয়মিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে সোমবার রাতে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে থেকে শামসুজ্জামান ডাবলুকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই সময় ভয়ে স্ট্রোকজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।’
তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মকবুল হাসান বলেছেন, ‘সুরতহালে মরদেহের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।’
এদিকে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুকে ‘নির্যাতন করে মেরে ফেলার’ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সোমবার মধ্যরাতেই রাস্তায় নেমে আসেন। তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সড়কে কাঠের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। রাতভর বিক্ষোভ শেষে গতকাল সকালে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, জড়িতদের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত না পাওয়া পর্যন্ত তারা রাস্তা ছাড়বেন না। তারা ময়নাতদন্তের জন্য লাশও হস্তান্তর করবেন না। এমন পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে হামলার শিকার হন জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ সোলায়মান।
পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে যান চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তারা দুজন আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে কথা বলেন। তাদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. শরীফুজ্জামান কথা বলেন।
এ সময় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি এবং আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আপনরা একটু ধৈর্য ধরুন। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সবকিছু হবে। তাদের বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীরা শান্ত হন। পরে ডাবলুর মরদেহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গায় পাঠানো হয়।
‘স্বামী হত্যার বিচার চাই’: শামসুজ্জামান ডাবলু স্ত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমি স্বামীর হত্যার বিচার চাই। তাকে পরিকল্পতিভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমার তিনটা মাসুম বাচ্চাকে এতিম করা হয়েছে। সঠিক বিচার চাই আমি, তারা কেন এভাবে হত্যা করল বিনা অপরাধে। অপরাধী হয়ে থাকলে ধরে নিয়ে যাবে, কেন মেরে ফেলা হলো তাকে?’
চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপি ও বিজিএমইএর সভাপতি এবং চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে জিওসি ব্রিগেডিয়ার ওসমানীর সঙ্গে বলেছি। উনি বলেছেন, আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ বিচার করা হবে। আমরা সে অপেক্ষায় আছি।’
বিএনপি মহাসচিবের শোক ও দুঃখ প্রকাশ: সেনা হেফাজতে বিএনপি নেতার মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিবৃতিতে তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলুকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র উদ্ধারের নামে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছে। এ রকম হত্যা কখনোই দেশের মানুষের কাছে সমর্থনযোগ্য নয়। আমি এ ধরনের লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
তিনি বলেন, আমি উল্লিখিত পৈশাচিক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।