

খাতা-কলমের সেই চিরচেনা লড়াই আর পরীক্ষার আগের সেই টানটান উত্তেজনা আবারও ফিরছে প্রাথমিকের আঙিনায়। শিশুদের পড়ার টেবিলে ফেরানো, ডিভাইসের আসক্তি কমিয়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ফিরছে পরীক্ষা। আর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাড়ানো হয়েছে সামষ্টিক মূল্যায়নের (লিখিত) নম্বর। এতে বদলে যাচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের সমীকরণও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ২৬ জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) এক সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে এতদিনের শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে সরে এসে এখন থেকে ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন (পরীক্ষা) এবং ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ফলাফল নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সামষ্টিক মূল্যায়নের গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আনা হয়েছে বড় পরিবর্তন। এই শ্রেণিতে আগে ৪০ শতাংশ ধারাবাহিক এবং ৬০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ১০ শতাংশ কমিয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে এবং সেই ১০ শতাংশ যুক্ত হয়েছে সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে। এতে তৃতীয় শ্রেণিতে সামষ্টিক মূল্যায়নের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতেও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ দুই শ্রেণিতে এখন থেকে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক এবং ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ফল নির্ধারণ করা হবে। চলতি সপ্তাহেই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের নতুন নির্দেশিকা জারি করার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা কমাতে তৎকালীন সরকার ২০২১ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা বাতিল করে। এতে সুফলের পরিবর্তে খুদে শিক্ষার্থীরা বইবিমুখ ও ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বাসায় নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাসও দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক স্তরে ফের পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২১ ডিসেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী। চিঠিতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকার একটি গাইডলাইন তুলে ধরা হয়। এর আগে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) ২০২৬ সালের বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনায় সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে ‘গাইডেড রিডিং রুটিন (জিআরআর)’ মডেল এবং বহুমুখী সহশিক্ষা কার্যক্রম চালুর একটি রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন এই মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে প্রথম দফায় গত ১৩ জানুয়ারি এবং পরবর্তী সময়ে ২৬ জানুয়ারি এনসিসির সভা হয়। ওই সভায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সবার মতামতের ভিত্তিতেই প্রাথমিক স্তরের জন্য নতুন মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে নেপ মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ কালবেলাকে বলেন, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিকে শিশুরা আরও বেশি শ্রেণিমুখী হবে, সঙ্গে শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা বাড়বে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, নতুন মূল্যায়ন নির্দেশকা প্রাথমিক স্তরে আমূল পরিবর্তন আনবে। আশা করছি চলতি সপ্তাহে মূল্যায়নের নতুন নির্দেশিকা জারি করা হবে।
নতুন মূল্যায়ন প্রস্তাবে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৫০ শতাংশ লিখিত (সামষ্টিক) পরীক্ষা, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ লিখিত পরীক্ষা ও ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিকে জিআরআর মূল্যায়ন: নেপের প্রস্তাবে প্রাথমিকে জিআরআর মূল্যায়ন পদ্ধতি কথা বলা হয়। এ পদ্ধতিতে মুখস্থবিদ্যার চিরচেনা পথ ছেড়ে খুদে শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক করে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এটা এমন একটি কাঠামো যেখানে শিক্ষক ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে শিখতে সক্ষম করে তুলবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের পঠন দক্ষতা উন্নয়নে জিআরআর মূল্যায়ন পদ্ধতি ‘গ্র্যাজুয়াল রিলিজ অব রেসপনসিবিলিটি’ নামে পরিচিত। জিআরআর হলো একটি শিক্ষণ পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষক ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের ওপর শেখার দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এখানে শিক্ষার্থীদের ‘আমি করি, আমরা করি, তুমি একা করো’ (I do, we do, you do) কৌশলে শেখানো হয়। এটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হবে। শিক্ষক প্রথমে নিজে পড়ে শোনাবেন, এরপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলে একসঙ্গে পড়বেন, তারপর জুটিতে বা সহপাঠীরা মিলে একে অপরকে সহযোগিতা করে পড়বে এবং সর্বশেষ শিক্ষার্থী শিক্ষক বা অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই নিজে পড়তে শিখবে।
এ রূপরেখার সঙ্গে যুক্ত নেপের বিশেষজ্ঞরা জানান, নতুন মানবণ্টনে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের দুর্বল জায়গাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যাবে। এ ছাড়া শিশুদের শুধু অক্ষরজ্ঞানই নয়, বরং স্বাধীনভাবে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রারম্ভিক স্তরে (প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণি) শিক্ষকের সহায়তায় ‘পড়তে শেখা’ এবং পরবর্তী স্তরে (তৃতীয়-পঞ্চম শ্রেণি) নিজে নিজে ‘পড়তে শেখার’ ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পুরো প্রক্রিয়াতে শিক্ষকের সহায়তা ধীরে ধীরে কমিয়ে শিক্ষার্থীকে স্বনির্ভর করে তোলা হয়। সহায়ক হিসেবে এসআরএম (সাপ্লিমেন্টারি রিডিং ম্যাটেরিয়ালস) থাকবে, যেখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাড়তি জ্ঞানের জন্য সরবরাহ করা হবে সম্পূরক পঠন সামগ্রী। শ্রেণিকক্ষে গল্পের বইয়ের মাধ্যমে শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। প্রতিটি বিদ্যালয়ে এ বইগুলো বিতরণের জন্য সুনির্দিষ্ট রেজিস্টার ও ‘বুক ক্যাপ্টেন’ নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশ বা পুথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ১০টিরও বেশি কার্যক্রমকে পাঠ পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বাস্থ্য ও পরিবেশ, সাংস্কৃতিক চর্চা যেমন ছড়া, গান, কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ও একক অভিনয়। দক্ষতা উন্নয়নে সুন্দর হাতের লেখা, ইংরেজি কথোপকথন ও উপস্থিত বক্তৃতা থাকবে। উদ্ভাবনী আইডিয়া প্রকাশ এবং দলভিত্তিক বিজ্ঞান মেলার আয়োজনও করা হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করতে আমরা একটি সমন্বিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা পাঠিয়েছি। তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা জারি করবে, আমরা শুধু বাস্তবায়ন করব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখা, দক্ষতা ও প্রয়োগ ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিখন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থীর সার্বিক দক্ষতা নিরূপণ সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি ভীতি কমে শেখার প্রতি আগ্রহ ও আনন্দ বাড়বে।
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আগে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়ন (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ধারাবাহিক নম্বর রাখা হয়েছে ৫০ এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় রাখা হয়েছে বাকি ৫০ নম্বর। এই দুই শ্রেণিতে অন্য বিষয়গুলোয় ৫০ নম্বরের মধ্যে ২৫ ধারাবাহিক মূল্যায়নে এবং ২৫ সামষ্টিক মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম শিক্ষা বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ ধারাবাহিক নম্বর এবং সামষ্টিকে (লিখিত ও মৌখিক বা ব্যাবহারিক পরীক্ষা) ৭০ নম্বর রাখা হয়েছে। শিল্পকলা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে ৫০ নম্বরের মধ্যে ধারাবাহিক মূল্যায়নে ১৫ ও সামষ্টিক মূল্যায়নে ৩৫ নম্বর রাখা হয়েছে।
মন্তব্য করুন